(Book# 114/٢٤٨)-৪৫০ www.motaher21.net সুরা: আল-আনয়াম ৯১-৯২ নং আয়াত:- وَمَا قَدَرُواْ اللّهَ حَقَّ قَدْرِهِ إِذْ قَالُواْ এই লোকেরা আল্লাহর যথাযথ মর্যাদা উপলব্ধি করেনি। They did not estimate Allah with an estimation due to Him when they said:

أعوذ باللّٰه من الشيطان الرجيم

بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيمِ

(Book# 114/٢٤٨)-৪৫০
www.motaher21.net
সুরা: আল-আনয়াম
৯১-৯২ নং আয়াত:-
وَمَا قَدَرُواْ اللّهَ حَقَّ قَدْرِهِ إِذْ قَالُواْ
এই লোকেরা আল্লাহর যথাযথ মর্যাদা উপলব্ধি করেনি।
They did not estimate Allah with an estimation due to Him when they said:

وَ مَا قَدَرُوا اللّٰہَ حَقَّ قَدۡرِہٖۤ اِذۡ قَالُوۡا مَاۤ اَنۡزَلَ اللّٰہُ عَلٰی بَشَرٍ مِّنۡ شَیۡءٍ ؕ قُلۡ مَنۡ اَنۡزَلَ الۡکِتٰبَ الَّذِیۡ جَآءَ بِہٖ مُوۡسٰی نُوۡرًا وَّ ہُدًی لِّلنَّاسِ تَجۡعَلُوۡنَہٗ قَرَاطِیۡسَ تُبۡدُوۡنَہَا وَ تُخۡفُوۡنَ کَثِیۡرًا ۚ وَ عُلِّمۡتُمۡ مَّا لَمۡ تَعۡلَمُوۡۤا اَنۡتُمۡ وَ لَاۤ اٰبَآؤُکُمۡ ؕ قُلِ اللّٰہُ ۙ ثُمَّ ذَرۡہُمۡ فِیۡ خَوۡضِہِمۡ یَلۡعَبُوۡنَ ﴿۹۱﴾
এই লোকেরা আল্লাহর যথাযথ মর্যাদা উপলব্ধি করেনি। কেননা তারা বললঃ আল্লাহ কোন মানুষের উপর কোন কিছু অবতীর্ণ করেননি; তুমি তাদেরকে জিজ্ঞেস করঃ মানুষের হিদায়াত ও আলোকবর্তিকা রূপে যে কিতাব মূসা এনেছিল তা কে অবতীর্ণ করেছেন? তোমরা সেই কিতাব খন্ড খন্ড করে বিভিন্ন পত্রে রেখেছ, ওর কিয়দংশ তোমরা প্রকাশ করছ এবং বহুলাংশ গোপন করছ। (ঐ কিতাব দ্বারা) তোমাদেরকে বহু বিষয়ে অবহিত করা হয়েছে, যা তোমরা ও তোমাদের পূর্ব-পুরুষরা জানতেনা; তুমি বলে দাওঃ তা আল্লাহই অবতীর্ণ করেছেন। সুতরাং তুমি তাদেরকে তাদের বাতিল ধারণার উপর ছেড়ে দাও, তারা খেলা করতে থাকুক।
وَ ہٰذَا کِتٰبٌ اَنۡزَلۡنٰہُ مُبٰرَکٌ مُّصَدِّقُ الَّذِیۡ بَیۡنَ یَدَیۡہِ وَ لِتُنۡذِرَ اُمَّ الۡقُرٰی وَ مَنۡ حَوۡلَہَا ؕ وَ الَّذِیۡنَ یُؤۡمِنُوۡنَ بِالۡاٰخِرَۃِ یُؤۡمِنُوۡنَ بِہٖ وَ ہُمۡ عَلٰی صَلَاتِہِمۡ یُحَافِظُوۡنَ ﴿۹۲﴾
আর এই কিতাবও (কুরআন) আমিই অবতীর্ণ করেছি; যা খুবই বারাকাতময় কিতাব এবং পূর্বের সকল কিতাবকে সত্যায়িত করে থাকে, যেন তুমি কেন্দ্রীয় মাক্কা নগরী এবং ওর চতুস্পার্শ্বস্থ জনপদের লোকদেরকে ওর দ্বারা ভীতি প্রদর্শন কর। যারা পরকালে বিশ্বাস রাখে তারা এই কিতাবকেও বিশ্বাস করবে এবং ওর প্রতি ঈমান আনবে, আর তারা নিয়মিতভাবে সালাতও আদায় করে থাকে।

৯১-৯২ নং আয়াতের তাফসীর:
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ বলেছেন:-

(وَمَا قَدَرُوا اللّٰهَ حَقَّ قَدْرِه)

‘তারা আল্লাহকে যথার্থ মর্যাদা দেয়নি قَدَر এর অর্থ হল মূল্যায়ন করা, মর্যাদা দেয়া। উদ্দেশ্য হল: মক্কার এই মুশরিকরা রাসূল প্রেরণ হওয়া এবং গ্রন্থাদি নাযিল হবার কথা অস্বীকার করে। যার অর্থ হল: তারা আল্লাহ তা‘আলা সম্পর্কে সঠিক ঈমান রাখত না। নবুওয়াত ও রিসালাতকে অস্বীকার করার অন্যতম কারণ হল- আল্লাহ তা‘আলা সম্পর্কে অজ্ঞ ও ভুল ধারণা পোষণ করা। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

(أَكَانَ لِلنَّاسِ عَجَبًا أَنْ أَوْحَيْنَآ إِلٰي رَجُلٍ مِّنْهُمْ أَنْ أَنْذِرِ النَّاسَ وَبَشِّرِ الَّذِيْنَ اٰمَنُوْآ أَنَّ لَهُمْ قَدَمَ صِدْقٍ عِنْدَ رَبِّهِمْ قَالَ الْكٰفِرُوْنَ إِنَّ هٰذَا لَسٰحِرٌ مُّبِيْنٌ)

“মানুষের জন্য এটা কি আশ্চর্যের বিষয় যে, আমি তাদেরই একজনের নিকট ওয়াহী প্রেরণ করেছি এ মর্মে যে, তুমি মানুষকে সতর্ক কর‎ এবং মু’মিনদেরকে সুসংবাদ দাও যে, তাদের জন্য তাদের প্রতিপালকের নিকট আছে উচ্চ মর্যাদা! কাফিরগণ বলে, ‘এ তো এক সুস্পষ্ট জাদুকর!’ (সূরা ইউনুস ১০:২)

তাদের এ ভ্রান্ত বিশ্বাসের প্রতিবাদে আল্লাহ তা‘আলা নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলে দিলেন, বলে দাও- মূসা (আঃ) যে কিতাব নিয়ে এসেছেন তা কে নাযিল করেছেন? বল, একমাত্র আল্লাহ তা‘আলাই নাযিল করেছেন।

أُمَّ الْقُرٰي ‘উম্মুল কুরা’ বলতে মক্কাকে বুঝানো হয়েছে। আর وَمَنْ حَوْلَهَا বলতে আরব-অনারব তথা সমগ্র বিশ্বকে বুঝানো হয়েছে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

(قُلْ يٰٓأَيُّهَا النَّاسُ إِنِّيْ رَسُوْلُ اللّٰهِ إِلَيْكُمْ جَمِيْعَا)

“বল ‘হে মানুষ! আমি তোমাদের সকলের জন্য আল্লাহ্র প্রেরিত রাসূল”(সূরা আ‘রাফ ৭:১৫৮)

পরিশেষে আল্লাহ তা‘আলা পরকালে বিশ্বাসীদের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কথা তুলে ধরেছেন। তা হল, তারা পরকালের প্রতি ঈমান রাখে, তারা সালাতের হেফাযত করে অর্থাৎ সময়মত সঠিক পদ্ধতিতে সালাত আদায় করে।

আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়:

১. যারা মুশরিক বা কাফির তারা আল্লাহ তা‘আলাকে যথাযথ মর্যাদা দেয় না।
২. বাতিল পন্থীদের সাথে বিতর্কের পদ্ধতি জানতে পারলাম।

English Tafsir:-
Tafsir Ibn Kathir:-
Sura Anam
Verses :- 91-92

وَمَا قَدَرُواْ اللّهَ حَقَّ قَدْرِهِ إِذْ قَالُواْ

They did not estimate Allah with an estimation due to Him when they said:
The Messenger is but a Human to Whom the Book was Revealed by Inspiration

Allah says;

وَمَا قَدَرُواْ اللّهَ حَقَّ قَدْرِهِ إِذْ قَالُواْ

They did not estimate Allah with an estimation due to Him when they said:

Allah says that those who rejected His Messengers did not give Allah due consideration.

Ibn Abbas, Mujahid and Abdullah bin Kathir said that;

this Ayah was revealed about the Quraysh.

It was also said that it was revealed about some Jews.

مَا أَنزَلَ اللّهُ عَلَى بَشَرٍ مِّن شَيْءٍ

(They said):”Nothing did Allah send down to any human being (by inspiration).”

Allah also, said,

أَكَانَ لِلنَّاسِ عَجَبًا أَنْ أَوْحَيْنَأ إِلَى رَجُلٍ مِّنْهُمْ أَنْ أَنذِرِ النَّاسَ

Is it a wonder for mankind that We have inspired to a man from among themselves (saying):”Warn mankind.” (10:2)

and,

وَمَا مَنَعَ النَّاسَ أَن يُوْمِنُواْ إِذْ جَأءَهُمُ الْهُدَى إِلاَّ أَن قَالُواْ أَبَعَثَ اللَّهُ بَشَرًا رَّسُولاً

قُل لَوْ كَانَ فِى الاٌّرْضِ مَلَـيِكَةٌ يَمْشُونَ مُطْمَيِنِّينَ لَنَزَّلْنَا عَلَيْهِم مِّنَ السَّمَأءِ مَلَكًا رَّسُولاً

And nothing prevented men from believing when the guidance came to them, except that they said:”Has Allah sent a man as Messenger!”

Say:”If there were on the earth, angels walking about in peace and security, We should certainly have sent down for them from the heaven an angel as a Messenger.” (17:94-95)

Allah said here,

وَمَا قَدَرُواْ اللّهَ حَقَّ قَدْرِهِ إِذْ قَالُواْ مَا أَنزَلَ اللّهُ عَلَى بَشَرٍ مِّن شَيْءٍ

They did not estimate Allah with an estimation due to Him when they said:”Nothing did Allah send down to any human being (by inspiration).”

Allah answered them,

قُلْ مَنْ أَنزَلَ الْكِتَابَ الَّذِي جَاء بِهِ مُوسَى نُورًا وَهُدًى لِّلنَّاسِ

Say :”Who then sent down the Book which Musa brought, a light and a guidance to mankind!”

meaning, say, O Muhammad, to those who deny the concept that Allah sent down Books by revelation, answering them specifically,
مَنْ أَنزَلَ الْكِتَابَ الَّذِي جَاء بِهِ مُوسَى
(Who then sent down the Book which Musa brought) in reference to the Tawrah that you and all others know that Allah sent down to Musa, son of Imran.

Allah sent the Tawrah as a light and a guidance for people, so that it could shed light on the answers to various disputes, and to guide away from the darkness of doubts.

Allah’s statement,

تَجْعَلُونَهُ قَرَاطِيسَ تُبْدُونَهَا وَتُخْفُونَ كَثِيرًا

which you have made into (separate) paper sheets, disclosing (some of it) and concealing (much).

means, you made the Tawrah into separate sheets which you copied from the original and altered, changed and distorted as you wished. You then said, “this is from Allah,” meaning it is in the revealed Book of Allah, when in fact, it is not from Allah. This is why Allah said here,
تَجْعَلُونَهُ قَرَاطِيسَ تُبْدُونَهَا وَتُخْفُونَ كَثِيرًا
(which you have made into (separate) paper sheets, disclosing (some of it) and concealing (much)).

Allah said;

وَعُلِّمْتُم مَّا لَمْ تَعْلَمُواْ أَنتُمْ وَلَا ابَاوُكُمْ

And you were taught that which neither you nor your fathers knew.

meaning, Who sent down the Qur’an in which Allah taught you the news of those who were before you and the news of what will come after, that neither you nor your fathers had knowledge of.

Allah’s statement,

قُلِ اللّهُ

Say:”Allah.”

Ali bin Abi Talhah reported that Ibn Abbas said,

“Meaning, `Say, Allah sent it down.”‘

Allah said,

ثُمَّ ذَرْهُمْ فِي خَوْضِهِمْ يَلْعَبُونَ

Then leave them to play in their vain discussions.

leave them to play in ignorance and misguidance until the true news comes to them from Allah. Then, they will know whether the good end is theirs or for the fearful servants of Allah.

Allah said

وَهَـذَا كِتَابٌ

And this is a Book, (the Qur’an),

أَنزَلْنَاهُ مُبَارَكٌ مُّصَدِّقُ الَّذِي بَيْنَ يَدَيْهِ وَلِتُنذِرَ أُمَّ الْقُرَى

Blessed, which We have sent down, confirming which came before it, so that you may warn the Mother of Towns,

that is, Makkah,

وَمَنْ حَوْلَهَا

and all those around it…

referring to the Arabs and the rest of the children of Adam, Arabs and non-Arabs alike.

Allah said in other Ayat,

قُلْ يَأَيُّهَا النَّاسُ إِنِّى رَسُولُ اللَّهِ إِلَيْكُمْ جَمِيعًا

Say:”O mankind! Verily, I am sent to you all as the Messenger of Allah.” (7:158)

and,

لااٌّنذِرَكُمْ بِهِ وَمَن بَلَغَ

“that I may therewith warn you and whomsoever it may reach.” (6:19)

and,

وَمَن يَكْفُرْ بِهِ مِنَ الاٌّحْزَابِ فَالنَّارُ مَوْعِدُهُ

but those of the sects who reject it, the Fire will be their promised meeting place. (11:17)

and,

تَبَارَكَ الَّذِى نَزَّلَ الْفُرْقَانَ عَلَى عَبْدِهِ لِيَكُونَ لِلْعَـلَمِينَ نَذِيراً

Blessed be He Who sent down the criterion to His servant that he may be a warner to the Alamin (mankind and Jinn). (25:1)

and,

وَقُلْ لِّلَّذِينَ أُوتُواْ الْكِتَـبَ وَالاٍّمِّيِّينَ ءَأَسْلَمْتُمْ فَإِنْ أَسْلَمُواْ فَقَدِ اهْتَدَواْ وَّإِن تَوَلَّوْاْ فَإِنَّمَا عَلَيْكَ الْبَلَـغُ وَاللَّهُ بَصِيرٌ بِالْعِبَادِ

And say to those who were given the Scripture and to those who are illiterates:”Do you submit yourselves!” If they do, they are rightly guided; but if they turn away, your duty is only to convey the Message; and Allah is All-Seer of (His) servants. (3:20)

It is recorded in the Two Sahihs, that the Messenger of Allah said,

أُعْطِيتُ خَمْسًا لَمْ يُعْطَهُنَّ أَحَدٌ مِنَ الاَْنْبِيَاءِ قَبْلِي

I have been given five things which were not given to any one else before me.

The Prophet mentioned among these five things,

وَكَانَ النَّبِيُّ يُبْعَثُ إِلَى قَوْمِهِ خَاصَّةً وَبُعِثْتُ إِلَى النَّاسِ عَامَّة

Every Prophet was sent only to his nation, but I have been sent to all people.

This is why Allah said,

وَالَّذِينَ يُوْمِنُونَ بِالاخِرَةِ يُوْمِنُونَ بِهِ

Those who believe in the Hereafter believe in it,

meaning, those who believe in Allah and the Last Day, believe in this blessed Book, the Qur’an, which We revealed to you, O Muhammad.

وَهُمْ عَلَى صَلَتِهِمْ يُحَافِظُونَ

and they are constant in guarding their Salah.

for they perform what Allah ordered them, offering the prayers perfectly and on time.

তাফসীরে ইবনে ‌কাসীর বলেছেন:-
৯১-৯২ নং আয়াতের তাফসীর:

আল্লাহ পাক বলেন-তারা যখন আল্লাহর রাসূল (সঃ)-কে অবিশ্বাস করলো তখন বুঝা গেল যে, তারা আল্লাহ তা’আলার মর্যাদার হক আদায় করলো না। আবদুল্লাহ ইবনে কাসীর (রঃ) বলেন যে, এই আয়াতটি কুরায়েশদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। আবার একথাও বলা হয়েছে যে, এটা ইয়াহুদীদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। অথবা এটা অবতীর্ণ হয় মালিক ইবনে সায়েফের ব্যাপারে। এই নির্বোধদের উক্তি এই যে, আল্লাহ তাআলা কোন মানুষের উপর কিতাব অবতীর্ণ করেননি। শানে নুযূল হিসেবে প্রথম উক্তিটিই সঠিকতম। কেননা, এ আয়াতটি মক্কায় অবতীর্ণ হয়। আর ইয়াহূদীরা তো এ কথা বলতো না যে, মানুষের উপর কোন কিতাব অবতীর্ণ হয়নি। কেননা, তারা তো এটা স্বীকার করে যে, তাওরাত হযরত মূসা (আঃ)-এর উপর অবতীর্ণ হয়েছিল। মক্কার অধিবাসী কুরায়েশ ও আরবরাই মুহাম্মাদ (সঃ)-কে অস্বীকার করতো। তাদের দলীল ছিল এই যে, মুহাম্মাদ (সঃ) একজন মানুষ এবং মানুষের উপর কিতাব অবতীর্ণ হয় না। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি মানুষের মধ্য হতে কারও উপর অহী পাঠাই- তুমি তাদেরকে (কুফরী থেকে) ভয় প্রদর্শন কর, এতে কি মানুষেরা বিস্ময় বোধ করে?” (১০:২) আরও ইরশাদ হচ্ছে- (আরবী) অর্থাৎ “যখন তাদের কাছে হিদায়াত পৌঁছে তখন যে জিনিস তাদেরকে ঈমান আনয়নে বাধা দেয় তা হচ্ছে এই যে, তাদের কথা ছিল- আল্লাহ কি কোন মানুষকে রাসূল করে পাঠিয়েছেন? হে নবী (সঃ)! তুমি তাদেরকে বল, ফেরেশতারা যদি ভূ-পৃষ্ঠে চলাফেরা করার প্রাণী হতো তবে কোন ফেরেশতাকেই আমি রাসূল করে পাঠাতাম।” (১৮:৫৫) এখন আল্লাহ পাক এখানে বলেনঃ আল্লাহর যেরূপ মর্যাদা দেয়া উচিত তা তারা দেয়নি। অর্থাৎ তারা বলে দিলো যে, আল্লাহ কোন মানুষের উপর কিছু অবতীর্ণ করেননি। হে নবী (সঃ)! তুমি তাদেরকে বলে দাও- আল্লাহ মূসা (আঃ)-এর উপর কিতাব অবতীর্ণ করেছিলেন। যে কিতাব লোকদের উপর নূর ও হিদায়াত রূপে প্রমাণিত হয়েছে। হযরত মূসা (আঃ) কর্তৃক পেশকৃত কিতাব তাওরাত’ কার দ্বারা অবতীর্ণ করা হয়েছে? তোমরা এবং সবাই একথা অবগত যে, মূসা ইবনে ইমরান (আঃ)-এর কিতাব আল্লাহ কর্তৃকই অবতারিত ছিল। যদ্দ্বারা মানুষ হিদায়াতের আলো লাভ করতো এবং সন্দেহের অন্ধকারে সোজা সরল পথ খুঁজে পেতো।

মহান আল্লাহ বলেন, তোমরা তাওরাতকে খণ্ড খণ্ড করে বিভিন্ন পত্রে রেখেছো, কিন্তু তাতে লিখতে গিয়ে নিজেদের পক্ষ থেকে পরিবর্ধনও করতে রয়েছে। আর বলতে রয়েছে, এটাও আল্লাহরই আয়াত। এজন্যে আল্লাহ পাক বলেন, কিছু কিছু প্রকৃত আয়াত প্রকাশ করছো বটে, কিন্তু অধিকাংশ আয়াতকেই তোমরা গোপন করছে।

আল্লাহ তা’আলার উক্তি- এই কিতাবের মাধ্যমে তোমরা এমন কিছু জেনেছো যা তোমরাও জানতে না এবং তোমাদের পূর্বপুরুষরা। অর্থাৎ হে কুরায়েশের দল! কে এই কুরআন অবতীর্ণ করেছেন, যাতে অতীতের সংবাদ রয়েছে এবং ভবিষ্যত বাণীও বিদ্যমান আছে যেগুলো না তোমরা জানতে, না তোমাদের বাপ-দাদারা জানত। কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এই সম্বোধন আরবের মুশরিকদেরকে করা হয়েছে। আর মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এই সম্বোধন মুসলমানদেরকেই করা হয়েছে। যখন আল্লাহ তাআলা বলেনঃ এই প্রশ্নের উত্তর তুমি নিজেই প্রদান কর যে, এই কুরআন আল্লাহই অবতীর্ণ করেছেন। এটা হচ্ছে ওটাই যা হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেছেন এবং এই শব্দের তাফসীরে এটাই নির্দিষ্ট। তাফসীর এই রূপ নয় যা পরবর্তী গুরুজনরা বলেছেন। তা এই যে, (আরবী) -এর অর্থ হচ্ছে- হে মুহাম্মাদ (সঃ)! তাদের প্রতি তোমার সম্বোধন এটা ছাড়া নয় যে, এই শব্দ শুধু একক শব্দ, অর্থাৎ শব্দটি হচ্ছে ‘আল্লাহ’। এতে এটা অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়বে যে, একটা একক শব্দ বাক্যও হতে পারে যা (আরবী) বা অমিশ্রিত শব্দ। কিন্তু একক শব্দকে আরবী অভিধানে (আরবী) মনে। করা হয় এবং ওর উপর (আরবী) বা নীরবতা চলতে পারে না।

আল্লাহ পাকের উক্তি- হে নবী (সঃ)! তুমি তাদেরকে বাতিল ধারণার উপর ছেড়ে দাও, তারা খেলা করতে থাকুক । অবশেষে মৃত্যুর পর তাদের বিশ্বাসের চক্ষু খুলে যাবে এবং পরিশেষে তারা আল্লাহ সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান লাভ করবে।

মহান আল্লাহর উক্তি- এই কুরআন হচ্ছে অত্যন্ত বরকতময় এবং এই কিতাব পূর্ববর্তী সমস্ত কিতাবকে সত্যায়িত করে থাকে। এ কিতাব তিনি এই জন্যেই অবতীর্ণ করেছেন যেন তুমি এর মাধ্যমে মক্কা ও তার চতুষ্পর্শ্বে বসবাসকারী আরব গোত্রগুলোকে এবং আরব ও আজমের আদম সন্তানদেরকে কুফর ও শিরকের ভয়াবহ পরিনাম থেকে ভীতি প্রদর্শন করতে পার। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ “হে রাসূল (সঃ)! তুমি বলে দাও- হে লোক সকল! নিশ্চয়ই আমি তোমাদের সকলের প্রতি রাসূল রূপে প্রেরিত হয়েছি, যেন আমি তোমাদেরকে সতর্ক করি এবং তাদেরকেও, যাদের কাছে আমার পয়গাম পৌঁছে যাবে।” (৭:১৫৮) মহান আল্লাহ আরও বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “দলসমূহের মধ্য থেকে যারা এর সাথে কুফরী করবে, তাদের জন্যে জাহান্নামের অঙ্গীকার রয়েছে।”(১১৪ ১৭) আল্লাহ তা’আলা আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “ঐ সত্তা কল্যাণময় যিনি স্বীয় বান্দার উপর (মুহাম্মাদ সঃ -এর উপর) ফুরকান (কুরআন) অবতীর্ণ করেছেন, যেন সে সারা বিশ্ববাসীর জন্যে ভয় প্রদর্শক হয়ে যায়।” (২৫:১) আল্লাহ পাক আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে নবী (সঃ)! তুমি আহলে কিতাব ও মূর্খদেরকে (মুশরিকদেরকে) বলে দাও- তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করলে? যদি তারা ইসলাম গ্রহণ করে তবে সুপথ লাভ করবে, আর যদি মুখ ফিরিয়ে নেয় তবে (তুমি সে জন্যে দায়ী নও) তোমার দায়িত্ব শুধু পৌঁছিয়ে দেয়া। আল্লাহ স্বীয় বান্দাদের সম্পর্কে পূর্ণ ওয়াকিফহাল।” (৩:২০) সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমাকে এমন পাঁচটি জিনিস দেয়া হয়েছে যেগুলো আমার পূর্ববর্তী নবীদের কাউকেই দেয়া হয়নি। ওগুলোর মধ্যে একটি এই যে, প্রত্যেক নবী নির্দিষ্টভাবে নিজের কওমের নিকটেই প্রেরিত হয়েছিলেন, আর আমি সারা বিশ্ববাসীর কাছেই প্রেরিত হয়েছি।” এজন্যেই আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যারা আল্লাহর উপর বিশ্বাস স্থাপন করে তারা এই কিতাবের (কুরআনের) উপরও বিশ্বাস রাখে যা আমি (হে মুহাম্মাদ সঃ) তোমার উপর অবতীর্ণ করেছি।” মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা এমনই মুমিন যে, তারা স্বীয় নামাযসমূহের পাবন্দী করে।” অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা যেমনভাবে সময়মত নামায আদায় করা তাদের উপর ফরয করে দিয়েছেন তারা সেভাবেই নামায আদায় করে থাকে।

তাফসীরে তাফহীমুল কুরআন বলেছেন:-
টিকা:৫৯) আগের ধারাবাহিক বর্ণনা ও পরবর্তী জওয়াবী ভাষণ থেকে একথা সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, এটি ছিল ইহুদীদের উক্তি। যেহেতু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দাবী ছিল, আমি নবী এবং আমার কাছে কিতাব অবতীর্ণ হয়েছে, তাই স্বাভাবিকভাবে কুরাইশ কাফের সম্প্রদায় এবং আরবের অন্যান্য মুশরিকরা এ দাবীর যথার্থতা অনুসন্ধান করার জন্য ইহুদী ও খৃস্টানদের কাছে যেতো এবং তাদেরকে জিজ্ঞেস করতো, তোমরাও তো নবী-রসূলদের মানো, বলো সত্যিই কি এ ব্যক্তির কাছে আল্লাহর কালাম নাযিল হয়েছে। এর জওয়াবে তারা যা বলতো নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কট্টর বিরোধী পক্ষ বিভিন্ন জায়গায় সে কথাগুলো বলে বলে লোকদেরকে বিভ্রান্ত ও উত্তেজিত করতো। তাই ইসলাম বিরোধীরা ইহুদীদের যে উক্তিটিকে প্রমাণ হিসেবে খাড়া করেছিল সেটি এখানে উদ্ধৃত করে তার জওয়াব দেয়া হচ্ছে।

প্রশ্ন করা যেতে পারে, তাওরাতকে আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিল করা কিতাব বলে মানে, এমন একজন ইহুদী কেমন করে বলতে পারে যে, আল্লাহ কোন মানুষের কাছে কিছুই নাযিল করেননি? কিন্তু এখানে এ প্রশ্নটি যথার্থ নয়। কারণ গোয়ার্তুমি ও হঠকারীতার বশবর্তী হয়ে অনেক সময় মানুষ অন্যের সত্য বক্তব্য অস্বীকার করতে গিয়ে এমন সব কথাও বলে ফেলে যা তার নিজের স্বীকৃত সত্যের পরিপন্থী হয়। তারা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুওয়াত প্রত্যাখ্যান করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছিল। ফলে বিরোধিতার জোশে তারা এমনই অন্ধ হয়ে পড়েছিল যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রিসালাতের প্রতিবাদ করতে করতে তারা এক সময় মূল রিসালাতকেই অস্বীকার করে বসে।

আর এখানে যে বলা হয়েছে, “তারা আল্লাহ্‌ সম্পর্কে বড়ই ভুল অনুমান করলো যখন তারা বললো”, এর অর্থ হচ্ছে, তারা আল্লাহর কুশলতা বিচক্ষণতা ও ক্ষমতার মূল্যায়নে ভুল করেছে। যে ব্যক্তি একথা বলে যে, আল্লাহ্‌ কোন মানুষের কাছে সত্যের জ্ঞান ও জীবন যাপনের জন্য পথ নির্দেশনা নাযিল করেননি, সে মানুষের কাছে অহী নাযিল হওয়াকে অসম্ভব মনে করে এবং এটি আল্লাহর ক্ষমতার অবমূল্যায়ন ও ভুল অনুমান ছাড়া আর কিছুই নয়। অথবা সে মনে করে, আল্লাহ্‌ তো মানুষকে বুদ্ধির অস্ত্র ও তা ব্যবহারের ক্ষমতা দিয়েছেন কিন্তু তার সঠিক পথ প্রদর্শনের কোন ব্যবস্থা করেননি বরং তাকে দুনিয়ার বুকে অন্ধের মতো কাজ করার জন্য ছেড়ে দিয়েছেন এবং এটি আল্লাহর কুশলতা ও প্রজ্ঞা সম্পর্কে ভুল অনুমান ছাড়া আর কিছুই নয়।

টিকা:৬০) এ জওয়াবটি যেহেতু ইহুদীদেরকে দেয়া হচ্ছে তাই মুসা আলাইহিস সালামের প্রতি তাওরাত নাযিলকে প্রমাণ হিসেবে পেশ করা হয়েছে। কারণ তারা নিজেরাই এটা মানতো। হযরত মুসা আলাইহিস সালামের ওপর তাওরাত নাযিল হয়েছিল একথা যখন তারা স্বীকার করতো তখন তাদের একথাটিই স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাদের এ বক্তব্যকে খণ্ডন করে যে, আল্লাহ্‌ কোন মানুষের ওপর কিছুই নাযিল করেননি। তাছাড়া এ থেকে কমপক্ষে এতটুকু কথা তো অবশ্যি প্রমাণ হয়ে যায় যে, মানুষের ওপর আল্লাহর কালাম নাযিল হতে পারে এবং ইতিপূর্বে হয়েছে।

টিকা:৬১) মানুষের ওপর আল্লাহর কালাম নাযিল হতে পারে এবং কার্যত হয়েছেও এরই স্বপক্ষে দেয়া হয়েছে প্রথম যুক্তিটি। এখন মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর যে কালামটি নাযিল হয়েছে সেটি আল্লাহরই কালাম, এর স্বপক্ষে দেয়া হচ্ছে এ দ্বিতীয় যুক্তিটি। এ সত্যটি প্রমাণ করার জন্য সাক্ষ্য হিসেবে চারটি কথা পেশ করা হয়েছে।

একঃ এ কিতাবটি বড়ই কল্যাণ ও বরকতপূর্ণ। অর্থাৎ মানুষের কল্যাণ ও উন্নয়নের জন্য এর মধ্যে সর্বোত্তম মূলনীতি পেশ করা হয়েছে। এখানে নির্ভুল ও সঠিক আকীদা-বিশ্বাসের শিক্ষা দেয়া হয়েছে সৎকাজের প্রতি উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে, উন্নত নৈতিক চারিত্রিক গুণাবলী সৃষ্টির উপদেশ দেয়া হয়েছে, পাক-পরিচ্ছন্ন জীবন যাপনের পথ নির্দেশনা দেয়া হয়েছে এবং অন্যদিকে মূর্খতা, অজ্ঞতা, স্বার্থপরতা, সংকীর্ণমনতা, জুলুম চরিত্রহীনতা, অশ্লীলতা ও অন্যান্য যেসব অসৎকর্ম তোমরা পবিত্র আসমানী কিতাবসমূহে স্তূপীকৃত করে রেখেছো সেগুলো থেকে এ কিতাবটিকে মুক্ত রাখা হয়েছে।

দুইঃ এর আগে আল্লাহর পক্ষ থেকে যেসব হেদায়াতনামা এসেছিল এ কিতাব সেগুলোকে পাশ কাটিয়ে অন্য কোন হেদায়াত পেশ করে না বরং সেগুলোয় যা কিছু পেশ করা হয়েছিল তার সত্যতা প্রমাণ করে এবং তার প্রতি সমর্থন যোগায়।

তিনঃ প্রত্যেক যুগে আল্লাহর পক্ষ থেকে যে উদ্দেশ্যে কিতাব নাযিল করা হয়েছে এ কিতাবটিও সে একই উদ্দেশ্যে নাযিল করা হয়েছে। অর্থাৎ মানুষকে গাফলতির নিঁদ থেকে জাগিয়ে সতর্ক করা এবং বিপথগামী লোকদেরকে সঠিক পথে পরিচালিত করাই এর উদ্দেশ্য।

চারঃ মানব সম্প্রদায়ের মধ্যে যারা দুনিয়া পূজারী ও প্রবৃত্তি লালসার দাসত্বে জীবন উৎসর্গকারী, এ কিতাব তাদেরকে দাওয়াত দিয়ে সমবেত করেনি বরং নিজের চারদিকে এমন সব লোককে সমবেত করেছে যাদের দৃষ্টি দুনিয়ার সংকীর্ণ সীমানা ছাড়িয়ে আরো আগে চলে যায়। তারপর এ কিতাবের দাওয়াতে প্রভাবিত হয়ে তাদের জীবনে যে বিপ্লব আসে তার সবচেয়ে সুস্পষ্ট আলামত হচ্ছে এই যে, তারা নিজেদের আল্লাহ্‌ প্রীতির কারণে সমগ্র মানব জাতির মধ্যে বিশিষ্টতা অর্জন করে। কোন মিথ্যাচারী ব্যক্তি যে কিতাব রচনা করেছেন এবং নিজের রচনাকে আল্লাহর রচনা বলে চালিয়ে দেবার চরম ধৃষ্ঠতা দেখিয়েছে তার সে কিতাব কি এহেন বৈশিষ্ট্য ও সুফলের অধিকারী হতে পারে?

Leave a Reply