Motaher21.net
أعوذ باللّٰه من الشيطان الرجيم
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيمِ
( বই # ১২২১/ হে মানুষ :-২৬)
[#সালাত ও কুরবানী
করতে হবে একমাত্র আল্লাহর জন্যই:-]
সুরা: ১০৮: আল-কাউসার
পারা:৩০
১- ৩ নং আয়াতের বেখ্যা :-
#তাফসীরে তাফহীমুল কুরআন:-
কুরআন:-
#তাফসীরে ফী জিলালিল
# তাফসীরে ফাতহুল মাজিদ:-
# তাফসীরে ইবনে কাছীর:-
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيمِ
(Book#1221/O Ye Mankind :-26)
[ # Pray to your Lord and sacrifice to Him alone].
Surah.108: Al-Kawthar
Para:30 Ayat:- 1- 3
www.motaher21.net
সুরা: আল-কাউসার
بِسْمِ اللّٰهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِیْمِ
পরম করুণাময় মেহেরবান আল্লাহর নামে
* ভূমিকা:১০৮
(১০৮-কাউসার) : নামকরণ:
إِنَّا أَعْطَيْنَاكَ الْكَوْثَرَ এ বাক্যের মধ্য থেকে ‘আল কাওসার’ শব্দটিকে এর নাম গণ্য করা হয়েছে।
(১০৮-কাউসার) : নাযিল হওয়ার সময়-কাল :
ইবনে মারদুইয়া, হযরত আবুদল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.), হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর (রা.) ও হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, এটি মক্কী সূরা। কাল্বী ও মুকাতিল একে মক্কী বলেন। অধিকাংশ তাফসীরকারও এ মত পোষণ করেন। কিন্তু হযরত হাসান বসরী, ইকরামা, মুজাহিদ ও কাতাদাহ একে মাদানী বলেন। ইমাম সুয়ূতী তাঁর ইতকান গ্রন্থে এ বক্তব্যকেই সঠিক গণ্য করেছেন। ইমাম মুসলিমও তাঁর শারহে মুসলিম গ্রন্থে এটিকে প্রাধান্য দিয়েছে। এর কারণ হচ্ছে ইমাম আহমাদ, মুসলিম, আবু দাউদ, নাসায়ী, ইবনে আবী শাইবা, ইবনুল মুনযির, ইবন মারদুইয়া ও বাইহাকী ইত্যাদি মুহাদ্দিসগণের হযরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত হাদীসটি। এ হাদীসে বলা হয়েছে: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের মধ্যে অবস্থান করছিলেন। এ সময় তিনি তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়লেন। তারপর তিনি মুচকি হাসতে হাসতে তাঁর মাথা উঠালেন। কোন কোন রেওয়ায়াতে বলা হয়েছে, লোকেরা জিজ্ঞেস করলো, আপনি মুচকি হাসছেন কেন? আবার কোন কোন রেওয়ায়াতে বলা হয়েছে তিনি নিজেই লোকদের বললেন: এখনি আমার ওপর একটি সূরা নাযিল হয়েছে। তারপর বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম বলে তিনি সূরা আল কাওসারটি পড়লেন। এরপর তিনি জিজ্ঞেস করেন, জানো কাওসার কি? সাহাবীরা বললেন: আল্লাহ ও তাঁর রসূল ভালো জানেন। বললেন: সেটি একটি নহর। আমার রব আমাকে জান্নাতে সেটি দান করেছেন। (এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা আসছে সামনের দিকের কাওসারের ব্যাখ্যা প্রসংগে।) এ হাদীসটির ভিত্তিতে এ সূরাটিকে মাদানী বলার কারণ হচ্ছে এই যে, হযরত আনাস (রা.) মক্কায় নয় বরং মদীনায় ছিলেন। এ সূরাটির মাদানী হবার প্রমাণ হচ্ছে এই যে, তিনি বলেছেন, তাঁর উপস্থিতিতেই এ সূরাটি নাযিল হয়।
কিন্তু প্রথমত এটা হযরত আনাস (রা.) থেকেই ইমাম আহমাদ, বুখারী, মুসলিম, আবু দাউদ, তিরমিযি ও ইবনে জারীর রেওয়ায়াত করেছেন যে, জান্নাতের এ নহরটি (কাওসার), রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে মি’রাজে দেখানো হয়েছিল। আর সবাই জানেন মি’রাজ মক্কায় অনুষ্ঠিত হয়েছিল হিজরতের আগে। দ্বিতীয়ত মি’রাজে যেখানে মহান আল্লাহ তাঁর রসূলকে কেবলমাত্র এটি দান করারই খবর দেননি বরং এটিকে তাঁকে দেখিয়ে দিয়েছিলেন সেখানে আবার তাঁকে এর সুসংবাদ দেবার জন্য মদীনা তাইয়েবায় সূরা কাওসার নাযিল করার কোন প্রয়োজন থাকতে পারে না। তৃতীয়ত যদি হযরত আনাসের উপরোল্লিখিত বর্ণনা অনুযায়ী রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে সাহাবীগণের একটি সমাবেশে সূরা কাওসার নাযিল হবার খবর দিয়ে থাকেন এবং তার অর্থ এ হয়ে থাকে যে, প্রথমবার এ সূরাটি নাযিল হলো, তাহলে হযরত আয়েশা (রা.), হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস ও হযরত আবদুল্লাহ ইবনেব যুবায়েরের মতো সতর্ক সাহাবীগণের পক্ষে কিভাবে এ সূরাটিকে মক্কী গণ্য করা সম্ভব। অন্যদিকে মুফাসসিরগণের অধিকাংশই বা কেমন করে একে মক্কী বলেন? এ ব্যাপারটি নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করলে হযরত আনাসের রেওয়ায়াতের মধ্যে একটি ফাঁক রয়েছে বলে পরিস্কার মনে হয়। যে মজলিসে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একথা বলেছিলেন সেখানে আগে থেকে কি কথাবার্তা চলছিল তার কোন বিস্তারিত বিবরণ তাতে নেই। সম্ভবত সে সময় রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোন ব্যাপারে কিছু বলছিলেন। এমন সময় অহীর মাধ্যমে তাঁকে জানানো হলো, সূরা কাওসারে সংশ্লিষ্ট ব্যাপারটির ওপর আলোকপাত করা হয়েছে। আর তখন তিনি একথাটি এভাবে বলেছেন: আমার প্রতি এ সূরাটি নাযিল হয়েছে। এ ধরনের ঘটনা কয়েকবার ঘটেছে। তাই মুফাসসিরগণ কোন কোন আয়াত সম্পর্কে বলেছেন, সেগুলো দু’বার নাযিল হয়েছে। এ দ্বিতীয়বার নাযিল হবার অর্থ হচ্ছে, আয়াত তো আগেই নাযিল হয়েছে কিন্তু দ্বিতীয়বার কোন সময় অহীর মাধ্যমে নবীর (সা.) দৃষ্টি এ আয়াতের প্রতি আকৃষ্ট করা হয়ে থাকবে। এ ধরনের রেওয়ায়াতে কোন আয়াতের নাযিল হবার কথা উল্লেখ থাকাটা তার মক্কী বা মাদানী হবার বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার জন্য যথেষ্ট নয়।
হযরত আনাসের এ রেওয়ায়াতটি যদি সন্দেহ সৃষ্টি করার কারণ না হয় তাহলে সুরা কাওসারের সমগ্র বক্তব্যই তার মক্কা মু’আয্যমায় নাযিল হবার সাক্ষ্য পেশ করে। এমন এক সময় নাযিল হওয়ার সাক্ষ্য পেশ করে যখন রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অত্যন্ত কঠিন হতাশা ব্যঞ্জক অবস্থার সম্মুখীন হয়েছিলেন।
(১০৮-কাউসার) : ঐতিহাসিক পটভূমি :
ইতিপূর্বে সূরা দুহা ও সূরা আলাম নাশরাহ-এ দেখা গেছে, নবুওয়াতের প্রাথমিক যুগে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন সবচেয়ে কঠিন সংকটের সম্মুখীন হয়েছিলেন, সমগ্র জাতি তাঁর সাথে শত্রুতা করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছিল, বাধার বিরাট পাহাড়গুলো তাঁর পথে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছিল, চতুর্দিকে প্রবল বিরোধিতা শুরু হয়ে গিয়েছিল এবং তিনি ও তাঁর মুষ্টিমেয় কয়েকজন সাথী বহুদূর পর্যন্ত কোথাও সাফল্যের কোন আলামত দেখতে পাচ্ছিলেন না। তখন তাঁকে সান্ত্বনা দেবার ও তাঁর মনে সাহস সঞ্চারের জন্য মহান আল্লাহ বহু আয়াত নাযিল করেন এর মধ্যে সূরা দুহায় তিনি বলেন: وَلَلْآخِرَةُ خَيْرٌ لَكَ مِنَ الْأُولَى – وَلَسَوْفَ يُعْطِيكَ رَبُّكَ فَتَرْضَى
“আর অবশ্যি তোমার জন্য পরবর্তী যুগ (অর্থাৎ প্রত্যেক যুগের পরের যুগ) পূর্ববর্তী যুগের চেয়ে ভালো এবং শীঘ্রই তোমার রব তোমাকে এমনসব কিছু দেবেন যাতে তুমি খুশী হয়ে যাবে।”
অন্যদিকে আলাম নাশরাহে বলেন: وَرَفَعْنَا لَكَ ذِكْرَكَ “আর আমি তোমার আওয়াজ বুলন্দ করে দিয়েছি।” অর্থাৎ শত্রু সারা দেশে তোমার দুর্নাম ছড়িয়ে বেড়াচ্ছে কিন্তু তাদের ইহার বিরুদ্ধে আমি তোমার নাম উজ্জ্বল করার এবং তোমাকে সুখ্যাতি দান করার ব্যবস্থা করে দিয়েছি। এই সাথে আরো বলেন: فَإِنَّ مَعَ الْعُسْرِ يُسْرًا – إِنَّ مَعَ الْعُسْرِ يُسْرًا “কাজেই, প্রকৃতপক্ষে সংকীর্ণতার সাথে প্রশস্ততাও আছে। নিশ্চিতভাবেই সংকীর্ণতার সাথে প্রশস্ততাও আছে।” অর্থাৎ বর্তমানে কঠিন অবস্থা দেখে পেরেশান হয়ো না। শীঘ্রই এ দু:খের দিন শেষ হয়ে যাচ্ছে। সাফল্যের যুগ এই তো শুরু হয়ে যাচ্ছে।
এমনি এক অবস্থা ও পরিস্থিতিতে সূরা কাওসার নাযিল করে আল্লাহ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সান্ত্বনা দান করেন এবং তাঁর শত্রুদেরকে ধ্বংস করে দেবার ভবিষ্যদ্বাণীও শুনিয়ে দেন। কুরাইশ বংশীয় কাফেররা বলতো, মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সমগ্র জাতি থেকে বিছিন্ন হয়ে গেছে। তাঁর অবস্থা হয়ে গেছে একজন সহায় ও বান্ধবহীন ব্যক্তির মতো । ইকরামা (রা.) বর্ণনা করেছেন: মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে যখন নবীর পদে অধিষ্ঠিত করা হয় এবং তিনি কুরাইশদেরকে ইসলামের দাওয়াত দিতে থাকেন তখন কুরাইশরা বলতে থাকে بتر محمد منا অর্থাৎ “মুহাম্মাদ নিজের জাতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এমন অবস্থায় পৌঁছে গেছে যেমন কোন গাছের শিকড় কেটে দেয়া হলে তার অবস্থা হয়। কিছুদিনের মধ্যে সেটি শুকিয়ে মাটির সাথে মিশে যায়।” (ইবনে জারীর) মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক বলেন, মক্কার সরদার আস ইবেন ওয়ায়েল সাহমির সামনে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কথা উঠলেই সে বলতো: “সে তো একজন আবতার অর্থাৎ শিকড় কাটা। কোন ছেলে সন্তান নেই। মরে গেলে তার নাম নেবার মতো কেউ থাকবে না।” শিমার ইবনে আতীয়্যার বর্ণনা মতে উকবা ইবনে আবু মু’আইতও রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে এমনি ধরনের কথা বলতো। (ইবনে জারীর) ইবনে আব্বাসের (রা.) বর্ণনা মতে, একবার কাব ইবনে আশরাফ (মদীনার ইহুদি সরদার) মক্কায় আসে। কুরাইশ সরদাররা তাকে বলে:
أَلاَ تَرَى إِلَى هَذَا الصَّبِيُّ الْمُنْبتِرْ مِنْ قَوْمِهِ يَزْعُمُ أَنَّهُ خَيْرٌ مِنَّا وَنَحْنُ أَهْلُ الْحَجِيجِ وَاَهْلُ السَّدَانَةِ واَهْلُ السَّقَايَةِ-
“এ ছেলেটির ব্যাপার-স্যাপার দেখো। সে তাঁর জাতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। সে মনে করে, সে আমাদের থেকে ভালো। অথচ আমরা হজ্বের ব্যবস্থাপনা করি, হাজীদের সেবা করি ও তাদের পানি পান করাই।” (বায্যার)
এ ঘটনাটি সম্পর্কে ইকরামা বলেন, কুরাইশরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে الصنبور النبتر من قومة বলে অভিহিত করতো। অর্থাৎ “তিনি এক অসহায়, বন্ধু-বান্ধবহীন, দুর্বল ও নি:সন্তান ব্যক্তি এবং নিজের জাতি থেকেও তিনি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন।” (ইবনে জারীর) ইবনে সা’দ ও ইবনে আসাকিরের বর্ণনা অনুযায়ী হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেছেন: রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সবচেয়ে বড় ছেলের নাম কাসেম (রা.), তার ছোট ছিলেন হযরত যয়নব (রা.)। তার ছোট ছিলেন হযরত আবদুল্লাহ (রা.)। তারপর জন্ম নেয় যথাক্রমে তিন কন্যা; হযরত উম্মে কুলসুম (রা.), হযরত ফাতেমা (রা.) ও হযরত রুকাইয়া (রা.)। এদের মধ্যে সর্ব প্রথম মারা যান হযরত কাসেম। তারপর মারা যান হযরত আবদুল্লাহ। এ অবস্থা দেখে আস ইবনে ওয়ায়েল বলে, তাঁর বংশই খতম হয়ে গেছে। এখন সে আবতার (অর্থাৎ তাঁর শিকড় কেটে গেছে)। কোন কোন রেওয়ায়াতে আরো একটু বাড়িয়ে আসের এই বক্তব্য এসেছে:
اِنَّ مُحَمَّدًا اَبْتَرُ لَا اِبْنَ لَهُ يَقُوْمَ مَقَامَهُ بَعْدَهُ فَاِذَا مَاتَ اِنْقَطَعَ ذِكْرُهُ وَاسْتَرَحْتُمْ مِنْهُ –
“মুহাম্মাদ একজন শিকড় কাটা। তাঁর কোন ছেলে নেই, যে তাঁর স্থালাভিষিক্ত হতে পারে। সে মরে গেলে তাঁর নাম মিটে যাবে। আর তখন তোমরা তাঁর হাত থেকে নিস্তার পাবে।”
আবদ ইবনে হুমাইদ ইবনে আব্বাসের যে রেওয়ায়াত উদ্ধৃত করেছেন, তা থেকে জানা যায় রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পুত্র আবদুল্লাহর মৃত্যুর পর আবু জেহেলও এই ধরনের কথা বলেছিল। ইবন আবী হাতেম শিমার ইবনে আতীয়াহ থেকে রেওয়ায়াত করেছেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শোকে আনন্দ প্রকাশ করতে গিয়ে উকবা ইবেন আবী মু’আইতও এই ধরনের হীন মনোবৃত্তির পরিচয় দেয়। আতা বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দ্বিতীয় পুত্রের ইন্তিকালের পর তাঁর চাচা আবু লাহাব (তার ঘর ছিল রসূলের ঘরের সাথে লাগোয়া) দৌড়ে মুশরিকদের কাছে চলে যায় এবং তাদের এই “সুখবর” দেয়: بَتِرَ مُحَمَّدٌ اللَّيْلَةَ অর্থাৎ রাতে মুহাম্মাদ সন্তানহারা হয়ে গেছে অথবা তাঁর শিকড় কেটে গেছে।”
এ ধরনের চরম হতাশাব্যাঞ্জক পরিস্থিতিতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর সূরা কাওসার নাযিল করা হয়।
(১০৮-কাউসার) : বিষয়বস্তু ও মূল বক্তব্য:
তিনি কেবল আল্লাহর বন্দেগী করতেন এবং আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে শরীক করাকে প্রকাশ্যে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। এ কারণে কুরাইশরা ছিল তাঁর প্রতি বিরূপ। এজন্যই নবুওয়াত লাভের আগে সমগ্র জাতির মধ্যে তাঁর যে মর্যাদা ছিল নবুওয়াত লাভের পর তা ছিনিয়ে নেয়া হয়েছিল। তাঁকে এক রকম জ্ঞাতি-গোত্র থেকে বিছিন্ন করে দেয়া হয়েছিল। তাঁর সংগী-সাথী ছিলেন মাত্র মুষ্টিমেয় কয়েকজন লোক। তারাও ছিলেন বন্ধু-বান্ধব ও সহায়-সম্বলহীন। তাঁরাও জুলুম-নিপীড়ন সহ্য করে চলছিলেন। এই সাথে তাঁর একের পর এক সন্তানের মৃত্যুতে তাঁর ওপর যেন দু:খ ও শোকের পাহাড় ভেঙে পড়েছিল। এ সময় আত্মীয়-স্বজন, জ্ঞাতি-গোষ্ঠী ও প্রতিবেশীদের পক্ষ থেকে যিনি শুধু আপন লোকদের সাথেই নয়, অপরিচিত ও অনাত্মীয়দের সাথেও সবসময় পরম প্রীতিপূর্ণ ও সহানুভূতিশীল ব্যবহার করছিলেন তাঁর বিরুদ্ধে এ ধরনের বিভিন্ন অপ্রীতিকর কথা ও আচরণ তাঁর মন ভেঙে দেবার জন্য যথেষ্ট ছিল। এ অবস্থায় এ ছোট্ট সূরাটির একটি বাক্যে আল্লাহ তাঁকে এমন একটি সুখবর দিয়েছেন যার চাইতে বড় সুখবর দুনিয়ার কোন মানুষকে কোন দিন দেয়া হয়নি। এই সংগে তাঁকে এ সিদ্ধান্তও শুনিয়ে দেয়া হয়েছে যে, তাঁর বিরোধিতাকারীদেরই শিকড় কেটে যাবে।
ফী জিলালিল কুরআন:
সংক্ষিপ্ত আলোচনা : এ সূরাটি বিশেষভাবে সর্বশেষ রসূল মোহাম্মদ (স.)-কে সম্বোধন করেই অবতীর্ণ হয়েছে। এ সূরাটি ‘দোহা’ ও সূরা ‘ইনশিরাহ’ এর অনুরূপ ৷ উল্লেখিত দুটি সূরায় রসূলুল্লাহ (স.)-এর উচ্চতর সম্মান ও মর্যাদা ঘোষণা করা হয়েছে। এ সূরায় আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তার হাবীব রসূলুল্লাহ (স.)-কে পর্যাপ্ত সম্মান, মর্যাদা, নেয়ামত ও কল্যাণ প্রদানের প্রতিশ্রুতি এবং তার শত্রুদেরকে শেকড়হীন ও নির্মূল করার হুশিয়ারী দিয়েছেন। প্রিয় নবীকে আল্লাহ্ তায়ালা তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের পদ্ধতি শিক্ষা দিয়েছেন। মক্কী জীবনে ‘দায়ী ইলাল্লাহ’ হিসাবে ইসলামী দাওয়াতের প্রাথমিক স্তরে অবতীর্ণ সূরা সমূহের মধ্যে এ ছোট্ট সূরাটি খুবই শিক্ষণীয় ও তাৎপর্যবহ ৷ এ সূরাটি ইসলাম বিরোধী শক্তির চক্রান্তকে চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ হওয়ার সুসংবাদ দিয়েছে এবং শত্রুদের দেয়া সকল কষ্ট, নির্যাতন ও অত্যাচারে ধৈর্য্য ধারণ ও মোমেনদের সংখ্যা স্বল্পতা সত্ত্বেও দুশমনের সকল নির্যাতন থেকে মুক্তি লাভের আশ্বাস ও সান্ত্বনা প্রদান করা হয়েছে। আল্লাহর অপার অনুগ্রহ প্রাপ্তির ইংগিত এ সূরায় নিহিত রয়েছে। সূরায় আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা তার প্রিয় বান্দার প্রতি আল্লাহপ্রদত্ত আদর্শের কথা বলেছেন। শত্রুদের মোকাবেলা করতে গিয়ে তাদের সকল বিরোধিতার সামনে দৃঢ়তা ও ধৈর্য্য অবলম্বনের তাগিদ দেয়া হয়েছে৷ শত্রুদেরকে ভীতিপ্রদ শাস্তি প্রদান, পর্যুদস্ত ও নির্মূল করার হুমকী প্রদর্শন করে ঈমানদারদের জন্য আল্লাহর সুন্দরতম নেয়ামত ও সুউচ্চ সম্মান দান করার আশ্বাস প্রদান করা হয়েছে। এতদপ্রসংগে সূরা কাওসারে হেদায়াত, ঈমান ও কল্যাণের প্রকৃত মর্ম ও তাৎপর্য, গোমরাহী অসৎপ্রবণতা, কুফরীর মর্ম ও চূড়ান্ত পরিণামের স্বরূপও উদঘাটিত করা হয়েছে। সাথে সাথে রসূলে আকরাম (স.)-এর প্রতি আল্লাহর অনন্ত অনুগ্রহ, চিরন্তন সম্মান মর্যাদা দানের কথার উল্লেখ রয়েছে। ইসলামের শত্রুদেরকে পর্যদস্তু ও নির্মূল হওয়ার সুসংবাদ দিয়ে প্রিয় হাবীবকে শান্ত ও আশ্বস্ত করা হয়েছে। যদিও কাফেররা মনে করতো স্বল্প সংখ্যক মুসলিম ও আল্লাহর রসুল পর্যুদস্তু ও পরাজিত হবে এবং এ কারণেই রসূলকে তারা শেকড়হীন ও আটকুঁড়ে বলে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করতো। বর্ণিত আছে যে, কোরায়শদের জঘন্য ব্যক্তিরা রসূলুল্লাহ (স.)এর চরম বিরোধিতা করার উদ্দেশ্যে ইসলামী দাওয়াতের প্রাথমিক যুগে তারা রসূলের বিরুদ্ধে মারাত্মক চক্রান্ত ষড়যন্ত্র শুরু করে। এ দুষ্কৃতকারীরা মানুষকে ইসলামী দাওয়াত থেকে দূরে রাখার উদ্দেশ্যে রসূলুল্লাহ (স.)-এর প্রতি নিকৃষ্ট ধরনের অপবাদ, দুর্নাম, অপপ্রচার চালায় । তাঁকে মানসিক অশান্তি ও দুশ্চিন্তা থেকে মুক্ত করার জন্যই সূরা কাওসার অবতীর্ণ হয়। এ সূরাতে রসূলুল্লাহ (স.)-কে মানসিক প্রশান্তি দান করার জন্য আল্লাহ তায়ালা তার রসূলকে অনন্ত নেয়ামত, প্রাচুর্য, সীমাহীন ও চিরন্তন অনুগ্রহ, সম্মান ও মর্যাদা দানের প্রতিশ্রুতি ও সংবাদ প্রদান করেছেন। সুরাটিতে রসূলের শত্রুদেরকেই পর্যুদস্তু, নির্মূল ও সহায় সম্বলহীন করার হুশিয়ারী প্রদান করা হয়।
সুরা: আল-কাউসার
আয়াত নং :-1
টিকা নং:1,
اِنَّاۤ اَعْطَیْنٰكَ الْكَوْثَرَؕ
(হে নবী!) আমি তোমাকে কাউসার দান করেছি।১
তাফসীর :
তাফহীমুল কুরআন:
টিকা:১) কাউসার শব্দটি এখানে যেভাবে ব্যবহৃত হয়েছে তাতে আমাদের ভাষায় তো দূরের কথা দুনিয়ার কোন ভাষায়ও এক শব্দে এর পূর্ণ অর্থ প্রকাশ করা সম্ভব নয়। এ শব্দটি মূলে কাসরাত كثرة থেকে বিপুল ও অত্যধিক পরিমাণ বুঝাবার অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। এর আভিধানিক অর্থ হচ্ছে, সীমাহীন আধিক্য। কিন্তু যে অবস্থায় ও পরিবেশে শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। তাতে শুধুমাত্র আধিক্য নয় বরং কল্যাণ ও নিয়ামতের আধিক্য এবং এমন ধরনের আধিক্যের ধারণা পাওয়া যায় যা বাহুল্য ও প্রাচুর্যের সীমান্তে পৌঁছে গেছে? আর এর অর্থ কোন একটি কল্যাণ বা নিয়ামত নয় বরং অসংখ্য কল্যাণ ও নিয়ামতের আধিক্য। ভূমিকায় আমি এ সূরার যে প্রেক্ষাপট বর্ণনা করেছি তার ওপর আর একবার দৃষ্টি বুলানো প্রয়োজন। তখন এক ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল। শত্রুরা মনে করছিল, মুহাম্মাদ ﷺ সবদিক দিয়ে ধ্বংস হয়ে গেছেন। জাতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বন্ধু-বান্ধব ও সহায়-সম্বলহীন হয়ে পড়েছেন। ব্যবসা ধ্বংস হয়ে গেছে। বংশে বাতি জ্বালাবার জন্য যে ছেলে সন্তান ছিল, সেও মারা গেছে। আবার তিনি এমন দাওয়াত নিয়ে ময়দানে নেমেছেন যার ফলে হাতে গোনা কয়েকজন ছাড়া মক্কা তো দূরের কথা সারা আরব দেশের কোন একটি লোকও তাঁর কথায় কান দিতে প্রস্তুত নয়। কাজেই তাঁর ভাগ্যের লিখন হচ্ছে জীবিত অবস্থায় ব্যর্থতা এবং মারা যাবার পরে দুনিয়ায় তাঁর নাম উচ্চারণ করার মতো একজন লোকও থাকবে না। এ অবস্থায় আল্লাহর পক্ষ থেকে যখন বলা হলো, তোমাকে কাওসার দান করেছি তখন স্বাভাবিকভাবে এর মানে দাঁড়ালোঃ তোমার শত্রুপক্ষীয় নির্বোধরা মনে করছে তুমি ধ্বংস হয়ে গেছো এবং নবুওয়াত লাভের পূর্বে তুমি যে নিয়ামত অর্জন করেছিলে তা তোমার কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে আমি তোমাকে সীমাহীন কল্যাণ ও অসংখ্য নিয়ামত দান করেছি। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে যে নজিরবিহীন উন্নত নৈতিক গুণাবলী দান করা হয়েছিল সেগুলোও এর অন্তর্ভুক্ত। তাঁকে যে নবুওয়াত, কুরআন এবং জ্ঞান ও তা প্রয়োগ করার মতো বুদ্ধিবৃত্তির নিয়ামতদান করা হয়েছিল তাও এর মধ্যে শামিল। তাওহীদও এমন ধরনের একটি জীবন ব্যবস্থার নিয়ামত এর অন্তর্ভুক্ত যার সহজ, সরল, সহজবোধ্য বুদ্ধি ও প্রকৃতির অনুসারী এবং পূর্ণাঙ্গ ও সার্বজনীন মূলনীতি সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ার এবং হামেশা ছড়িয়ে পড়তে থাকার ক্ষমতা রাখে। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আলোচনা ব্যাপকতর করার নিয়ামতও এর অন্তর্ভুক্ত যার বদৌলতে তাঁর নাম চৌদ্দশো বছর থেকে দুনিয়ার সর্বত্র বুলন্দ হচ্ছে এবং কিয়ামত পর্যন্ত বুলন্দ হতে থাকবে। তাঁর আহবানে অবশেষে এমন একটি বিশ্বব্যাপী উম্মাতের উম্ভব হয়েছে, যারা দুনিয়ায় চিরকালের জন্য আল্লাহর সত্য দ্বীনের ধারক হয়েছে, যাদের চাইতে বেশী সৎ নিষ্কলুষ ও উন্নত চরিত্রের মানুষ দুনিয়ার কোন উম্মাতের মধ্যে কখনো জন্ম লাভ করেনি এবং বিকৃতির অবস্থায় পৌঁছেও যারা নিজেদের মধ্যে দুনিয়ার সব জাতির চাইতেও বেশী কল্যাণ ও নেকীর গুণাবলী বহন করে চলছে। এ নিয়ামতটিও এর অন্তর্ভুক্ত। রসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর নিজের চোখে নিজের জীবদ্দশায় নিজের দাওয়াতকে সাফল্যের স্বর্ণশিখরে উঠতে দেখেছেন এবং তাঁর হাতে এমন জামায়াত তৈরি হয়েছে যারা সারা দুনিয়ার ওপর ছেড়ে যাবার ক্ষমতা রাখতো, এ নিয়ামতটিও এর অন্তর্ভুক্ত। ছেলে সন্তান থেকে বঞ্চিত হবার পর শত্রুরা মনে করতো তাঁর নাম-নিশানা দুনিয়া থেকে মিটে যাবে। কিন্তু আল্লাহ শুধু মুসলমানদের আকারে তাঁকে এমন ধরনের আধ্যাত্মিক সন্তান দিয়েই ক্ষান্ত হননি যারা কিয়ামত পর্যন্ত সারা দুনিয়ায় তাঁর নাম বুলন্দ করতে থাকবে বরং তাঁকে শুধুমাত্র একটি কন্যা হযরত ফাতোমার মাধ্যমে এত বিপুল পরিমাণ রক্তমাংসের সন্তান দান করেছেন যারা সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে এবং মহান নবীর সাথে সম্পর্কই যাদের সবচেয়ে বড় অহংকার। এটিও এ নিয়ামতের অন্তর্ভুক্ত।
নিয়ামতগুলো আল্লাহ তাঁর নবীকে এ মরজগতেই দান করেছেন। কত বিপুল পরিমাণে দান করেছেন তা লোকেরা দেখেছে। এগুলো ছাড়াও কাউসার বলতে আরো দু’টো মহান ও বিশাল নিয়ামত বুঝানো হয়েছে, যা আল্লাহ তাঁকে আখেরাতে দান করবেন। সেগুলো সম্পর্কে জানার কোন মাধ্যম আমাদের কাছে ছিল না। তাই রসূলল্লাহ ﷺ আমাদের সেগুলো সম্পর্কে জানিয়েছেন। তিনি বলেছেনঃ কাউসার বলতে দু’টি জিনিস বুঝানো হয়েছে। একটি হচ্ছে “হাউজে কাউসার” এটি কিয়ামতের ময়দানে তাঁকে দান করা হবে। আর দ্বিতীয়টি “কাউসার ঝরণাধারা” এটি জান্নাতে তাঁকে দান করা হবে। এ দু’টির ব্যাপারে রসূলুল্লাহ ﷺ থেকে এত বেশী হাদীস বর্ণিত হয়েছে এবং এত বিপুল সংখ্যক রাবী এ হাদীসগুলো বর্ণনা করেছেন যার ফলে এগুলোর নির্ভুল হবার ব্যাপারে সামান্যতম সন্দেহেরও অবকাশ নেই।
হাউজে কাউসার সম্পর্কে রসূলুল্লাহ ﷺ নিম্নরূপ তথ্য পরিবেশন করেছেনঃ
একঃ এ হাউজটি কিয়ামতের দিন তাঁকে দেয়া হবে। এমন এক কঠিন সময়ে এটি তাঁকে দেয়া হবে যখন সবাই “আল আতশ” ‘আল আতশ’ অর্থাৎ পিপাসা, পিপাসা বলে চিৎকার করতে থাকবে সে সময় তাঁর উম্মত তাঁর কাছে এ হাউজের চারদিকে সমবেত হবে এবং এর পানি পান করবে। তিনি সবার আগে সেখানে পৌঁছবেন এবং তার মাঝ বরাবর জায়গায় বসে থাকবেন। তাঁর উক্তিঃ
هو حوض ترد عليه امتى يوم القيامة
“সেটি একটি হাউজ। আমার উম্মাত কিয়ামতের দিন তার কাছে থাকবে।” (মুসলিম, কিতাবুস সারাত এবং আবু দাউদ, কিতাবুস সুন্নাহ)
انا فرطكم على الحوض
“আমি তোমাদের সবার আগে সেখানে পৌঁছে যাবো।” (বুখারী, কিতাবুর রিকাক ও কিতাবুল ফিতান, মুসলিম, কিতাবুল ফাযায়েল ও কিতাবুল তাহারাত, ইবনে মাজাহ, কিতাবুল মানাসিক ও কিতাবুয যুহদ এবং মুসনাদে আহমাদ, আবুদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.), আবুদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) ও আবু হুরাইরা (রা.) বর্ণিত রেওয়ায়াতসমূহ)।
إِنِّى فَرَطٌ لَكُمْ ، وَأَنَا شَهِيدٌ عَلَيْكُمْ ، وَإِنِّى وَاللَّهِ لأَنْظُرُ إِلَى حَوْضِى الآنَ
“আমি তোমাদের আগে পৌঁছে যাবো, তোমাদের জন্য সাক্ষ্য দেবো এবং আল্লাহর কসম, আমি এ মুহূর্তে আমার হাউজ দেখতে পাচ্ছি।” (বুখারী, কিতাবুল জানায়েয, কিতাবুল মাগাযী ও কিতাবুর রিকাক)। আনসারদেরকে সম্বোধন করে একবার তিনি বলেনঃ إِنَّكُمْ سَتَلْقَوْنَ بَعْدِى أَثَرَةً فَاصْبِرُوا حَتَّى تَلْقَوْنِى ، وَمَوْعِدُكُمُ الْحَوْضُ “আমার পরে তোমরা স্বার্থবাদিতা ও স্বজনপ্রীতির পাল্লায় পড়বে। তখন তার ওপর সবর করবে, আমার সাথে হাউজে কাউসারে এসে মিলিত হওয়া পর্যন্ত।” (বুখারী, কিতাবু মানাকিবিল আনসার ও কিতাবুল মাগাযী, মুসলিম, কিতাবুল আমারাহ এবং তিরমিযী কিতাবুল ফিতান।)
انا يوم القيمة عند عقر الحوض
“কিয়ামতের দিন হাউজের মাঝ বরাবর থাকবো।” (মুসলিম কিতাবুল ফাজায়েল) হযরত আবু বারযাহ আসলামীকে (রা.) জিজ্ঞেস করা হলো, আপনি কি হাউজ সম্পর্কে রসূলুল্লাহ ﷺ থেকে কিছু শুনেছেন। তিনি বলেন, “একবার নয়, দু’বার নয়, তিনবার নয়, চারবার নয়, পাঁচবার নয়, বারবার শুনেছি। যে ব্যক্তি একে মিথ্যা বলবে আল্লাহ তাকে যেন তার পানি পান না করান।” (আবু দাউদ, কিতাবুস সুন্নাহ)। উবাইদুল্লাহ ইবনে যিয়াদ হাউজ সম্পর্কিত রেওয়ায়াত মিথ্যা মনে করতো। এমন কি সে হযরত আবু বারযাহ আসলামী (রা.), বারাআ ইবনে আযেব (রা.) ও আয়েদ ইবনে আমর (রা.) বর্ণিত রেওয়ায়াতগুলো অস্বীকার করলো। শেষে আবু সাবরাহ একটি লিপি বের করে আনলেন। এ লিপিটি তিনি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আসের (রা.) মুখে শুনে লিখে রেখেছিলেন। তাতে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এ বাণী লেখা ছিলঃ الا ان موعد كم حوضى “জেনে রাখো, আমার ও তোমাদের সাক্ষাতের স্থান হচ্ছে আমার হাউজ।” (মুসনাদে আহমাদ, আবদুল্লাহ ইবনে আমার ইবনুল আসের রেওয়ায়াতসমূহ)।
দুইঃ এ হাউজের আয়তন সম্পর্কে বিভিন্ন হাদীসে বিভিন্ন প্রকার বর্ণনা এসেছে। তবে অধিকাংশ রেওয়ায়াতে বলা হয়েছেঃ এটি আইলা (ইসরাঈলের বর্তমান বন্দর আইলাত) থেকে ইয়ামনের সান’আ পর্যন্ত অথবা আইল থেকে এডেন পর্যন্ত কিংবা আম্মান থেকে এডেন পর্যন্ত দীর্ঘ হবে। আর এটি চওড়া হবে আইলা থেকে হুজকাহ (জেদ্দা ও রাবেগের মাঝখানে একটি স্থান) পর্যন্ত জায়গার সমপরিমাণ। (বুখারী, কিতাবুর রিকাক, আবু দাউদ তায়ালাসী ৯৯৫ হাদীস, মুসনাদে আহমাদ, আবু বকর সিদ্দীক ও আবদুল্লাহ ইবনে ওমর বর্ণিত রেওয়ায়াতসমূহ, মুসলিম-কিতাবুত তাহারাত ও কিতাবুল ফাজায়েল, তিরমিযি— আবওয়াবু সিফাতিল কিয়ামহ এবং ইবনে মাজাহ-কিতাবুয যুহুদ)। এ থেকে অনুমান করা যায়, বর্তমান লোহিত সাগরটিকেই কিয়ামতের দিন হাউজে কাউসারে পরিবর্তিত করে দেয়া হবে। তবে আসল ব্যাপার একমাত্র আল্লাহই ভালো জানে।
তিনঃ এ হাউজটি সম্পর্কে রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, জান্নাতের কাউসার ঝরণাধারা (সামনে এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে) থেকে পানি এনে এতে ঢালা হবে। একটি হাদীসে বলা হয়েছেঃ يشخب فيه ميزابان من الجنة এবং অন্য একটি হাদীসে বলা হয়েছেঃ
يعت فيه ميزابان يمدانه من الجنة
অর্থাৎ জান্নাত থেকে দু’টি খাল কেটে এনে তাতে ফেলা হবে এবং এর সাহায্যে থেকে তাতে পানি সরবরাহ হবে। (মুসলিম কিতাবুল ফাজায়েল) অন্য একটি হাদীসে বলা হয়েছেঃ
يفتح نهر من الكوثر الى الحوض
অর্থাৎ জান্নাতের কাওসার ঝরণাধারা থেকে একটি নহর এ হাউজের দিকে খুলে দেয়া হবে এবং তার সাহায্যে এতে পানি সরবরাহ জারী থাকবে (মুসনাদে আহমাদ, আবুদুল্লাহ ইবনে মাসউদ বর্ণিত রেওয়ায়াতসমূহ)।
চারঃ হাউজে কাউসারের অবস্থা সম্পর্কে রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন যে, তার পানি হবে দুধের চাইতে (কোন কোন রেওয়ায়াত অনুযায়ী রূপার চাইতে আবার কোন কোন রেয়ায়াত অনুযায়ী বরফের চাইতে) বেশী সাদা, বরফের চাইতে বেশী ঠাণ্ডা এবং মধুর চাইতে বেশী মিষ্টি। তার তলদেশের মাটি হবে মিশকের চাইতে বেশী সুগন্ধিযুক্ত। আকাশে যত তারা আছে ততটি সোরাহী তার পাশে রাখা থাকবে। তার পানি একবার পান করার পর দ্বিতীয়বার কারো পিপাসা লাগবে না। আর তার পানি যে একবার পান করেনি তার পিপাসা কোনদিন মিটবে না। সামান্য শাব্দিক হেরফেরসহ একথাগুলোই অসংখ্য হাদীসে উদ্ধৃত হয়েছে। (বুখারী কিতাবুর রিকাক, মুসলিম-কিতাবুত তাহারাত ও কিতাবুল ফাজায়েল, মুসনাদে আহমাদ-ইবনে মাসউদ, ইবনে উমর ও আবদুল্লাহ উবনে আমর ইবনুল ‘আস বর্ণিত রেওয়ায়াতসমূহ, তিরমিযী আবওয়াবু সিফাতিল কিয়ামহ, ইবনে মাজাহ-কিতাবুয যুহোদ এবং আবু দাউদ আত তায়ালাসী, ৯৯৫ ও ২১৩৫ হাদীস। পাঁচঃ রসূলুল্লাহ ﷺ বারবার তাঁর সময়ের লোকদের সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, আমার পরে তোমাদের মধ্য থেকে যারাই আমার তরিকা পদ্ধতি পরিবর্তন করবে তাদেরকে এ হাউজের কাছ থেকে হটিয়ে দেয়া হবে এবং এর পানির কাছে তাদের আসতে দেয়া হবে না। আমি বলবো, এরা আমার লোক। জবাবে আমাকে বলা হবে, আপনি জানেন না আপনার পরে এরা কি করেছে। তখন আমিও তাদেরকে তাড়িয়ে দেবো। আমি বলবো, দূর হয়ে যাও। এ বক্তব্যটি অসংখ্য হাদীসে উল্লেখিত হয়েছে। (বুখারী-কিতাবুল ফিতান ও কিতাবুর রিকাক, মুসলিম কিতাবুত তাহারাত ও কিতাবুল ফাজায়েল, মুসনাদে আহমাদ-ইবনে মাসউদ ও আবু হুরাইরা বর্ণিত হাদীসসমূহ, ইবনে মাজাহ— কিতাবুল মানাসিক।) ইবনে মাজাহ এ ব্যাপারে যে হাদীস উদ্ধৃত করেছেন তার শব্দগুলো বড়ই হৃদয়স্পর্শী। তাতে রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেনঃ
أَلاَ وَإِنِّى فَرَطُكُمْ عَلَى الْحَوْضِ وَأُكَاثِرُ بِكُمُ الأُمَمَ فَلاَ تُسَوِّدُوا وَجْهِى أَلاَ وَإِنِّى مُسْتَنْقِذٌ أُنَاسًا وَمُسْتَنْقَذٌ أُنَاسٌ مِنِّى فَأَقُولُ يَا رَبِّ أُصَيْحَابِى. فَيَقُولُ إِنَّكَ لاَ تَدْرِى مَا أَحْدَثُوا بَعْدَكَ
“সাবধান হয়ে যাও! আমি তোমাদের আগে হাউজে উপস্থিত থাকবো। তোমাদের মাধ্যমে অন্য উম্মাতদের মোকাবিলায় আমি নিজের উম্মাতের বিপুল সংখ্যার জন্য গর্ব করতে থাকবো। সে সময় আমার মুখে কালিমা লেপন করো না। সাবধান হয়ে যাও! কিছু লোককে আমি ছাড়িয়ে নেবো আর কিছু লোককে আমার কাছ থেকে ছাড়িয়ে নেয়া হবে। আমি বলবো হে আমার রব! এরা তো আমার সাহাবী। তিনি বলবেন, তুমি জানো না তোমার পরে এরা কী অভিনব কাজ কারবার করেছে।” ইবনে মাজার বক্তব্য হচ্ছে, এ শব্দগুলো রসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর আরাফাত ময়দানের ভাষণে বলেছিলেন।
ছয়ঃ এভাবে রসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর পর থেকে নিয়ে কিয়ামত পর্যন্ত সময় কালের সমগ্র মুসলিম মিল্লাতকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেনঃ তোমাদের মধ্য থেকে যারাই আমার পথ থেকে সরে গিয়ে অন্য পথে চলবে এবং তার মধ্যে রদবদল করবে তাদেরকে এ হাউজের কাছ থেকে সরিয়ে দেয়া হবে। আমি বলবোঃ হে আমার রব! এরা তো আমার উম্মাতের লোক। জবাবে বলা হবেঃ আপনি জানেন না, আপনার পরে এরা কি কি পরিবর্তন করেছিল এবং আপনার পথের উল্টো দিকে চলে গিয়েছিল। তখন আমিও তাদেরকে দূর করে দেবো এবং তাদেরকে হাউজের ধারে কাছে ঘেঁসতে দেবো না। হাদীস গ্রন্থগুলোতে এ বিষয়বস্তু সম্বলিত অসংখ্য হাদীস উল্লেখিত হয়েছে। (বুখারী— কিতাবুল মুসাকাত, কিতাবুর রিকাক ও কিতাবুল ফিতান, মুসলিম-কিতাবুত তাহারাত, কিতাবুস সালাত ও কিতাবুল ফাজায়েল, ইবনে মাজাহ—কিতাবুয যুহুদ, মুসনাদে আহামদ-আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস বর্ণিত হাদীসসমূহ)। পঞ্চাশ জনেরও বেশী সাহাবী এ হাউজ সংক্রান্ত হাদীসগুলো বর্ণনা করেছেন। প্রথম যুগের আলেমগণ সাধারণভাবে এটিকে হাউজে কাউসার বলেছেন। ইমাম বুখারী কিতাবুর রিকাকের শেষ অনুচ্ছেদের শিরোনাম রাখেন নিম্নোক্তভাবেঃ
باب فى الحوض وقول الله إِنَّا أَعْطَيْنَاكَ الْكَوْثَرَ (হাউজ অনুচ্ছেদ, আর আল্লাহ বলেছেনঃ আমি তোমাকে কাউসার দিয়েছি)। অন্যদিকে হযরত আনাসের রেওয়ায়াতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, রসূলুল্লাহ ﷺ কাউসার সম্পর্কে বলেছেনঃ
هو حوض ترد عليه امتى “সেটি একটি হাউজ। আমার উম্মাত সেখানে উপস্থিত হবে।”
জান্নাতে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কাউসার নামে যে নহরটি দেয়া হবে সেটির উল্লেখও অসংখ্য হাদীসে পাওয়া যায়। হযরত আনাস (রা.) থেকে এ সংক্রান্ত বহু হাদীস উদ্ধৃত হয়েছে। সেগুলোতে তিনি বলেনঃ (আবার কোন কোনটিতে তিনি স্পষ্টভাবে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উক্তি হিসেবেই বর্ণনা করেন) মি’রাজে রসূলুল্লাহকে ﷺ জান্নাতে সফর করানো হয়। এ সময় তিনি একটি নহর দেখেন। এ নহরের তীরদেশে ভিতর থেকে হীরা বা মুক্তার কারুকার্য করা গোলাকৃতির মেহরাবসমূহ ছিল, তার তলদেশের মাটি ছিল খাঁটি মিশকের সুগন্ধিযুক্ত। রসূলুল্লাহ ﷺ জিব্রীলকে বা যে ফেরেশতা তাঁকে ভ্রমণ করিয়েছিলেন তাঁকে জিজ্ঞেস করেন, এটা কি? ফেরেশতা জবাব দেন, এটা কাউসার নহর। আল্লাহ আপনাকে এ নহরটি দিয়েছেন। (মুসনাদে আহমাদ, বুখারী, তিরমিযী, আবু দাউদ তায়ালাসী ও ইবেন জারীর)। হযরত আনাস এক রেওয়ায়াতে বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করা হল, অথবা এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করেনঃ কাউসার কি? তিনি জবাব দিলেনঃ একটি নহর যা আল্লাহ আমাকে জান্নাতে দান করেছেন। এর মাটি মিশকের। এর পানি দুধের চাইতেও সাদা এবং মধুর চাইতে মিষ্টি। (মুসনাদে আহমাদ, তিরমিযী, ইবনে জারীর)। মুসনাদে আহমাদের অন্য একটি রেওয়ায়াতে বলা হয়েছে, রসূলুল্লাহ (সা.) নহরে কাউসারের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেনঃ তার তলদেশে কাঁকরের পরিবর্তে মণিমুক্তা পড়ে আছে। ইবনে ওমর (রা.) বলেন, রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেনঃ কাউসার জান্নাতের একটি নহর। এর তীরদেশ সোনার পরিবর্তে মূল্যবান পাথর বিছানো আছে।) এর মাটি মিশকের চাইতে বেশী সুগন্ধিযুক্ত। পানি দুধের চাইতে বেশী সাদা। বরফের চেয়ে বেশী ঠাণ্ডা ও মধুর চেয়ে বেশী মিষ্টি। (মুসনাদে আহমাদ, তিরমিযী, ইবনে মাজাহ, ইবনে আবী হাতেম, দারেমী, আবু দাউদ, ইবনুল মুনযির, ইবনে মারদুইয়া ও ইবনে আবী শাইবা)। উসামা ইবনে যায়েদ (রা.) রেওয়ায়াত করেছেন, রসূলুল্লাহ (সা.) একবার হযরত হামাযার (রা.) বাড়িতে যান। তিনি বাড়িতে ছিলেন না। তাঁর স্ত্রী নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মেহমানদারী করেন। আলাপ-আলোচনা করতে করতে এক সময় তিনি বলেন, আমার স্বামী আমাকে বলেছেন, আপনাকে জান্নাতে একটি নহর দেয়া হবে। তার নাম কাউসার। তিনি বলেনঃ “হ্যাঁ, তার যমীন ইয়াকুত, মারজান, যবরযদ ও মতির সমন্বেয় গঠিত। (ইবনে জারীর ও ইবন মারদুইয়া। এ হাদীসটির সূত্র দুর্বল হলেও এ বিষয়বস্তু সম্বলিত বিপুল সংখ্যক হাদীস পাওয়া যাওয়ার কারণে এর শক্তি বেড়ে গেছে)। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এ উক্তি এবং সাহাবা ও তাবেঈগণের অসংখ্য বক্তব্য হাদীসে উল্লেখিত হয়েছে। এ সবগুলোতে কাউসার বলতে জান্নাতের এ নহরই বুঝানো হয়েছে। ওপরে এ নহরের যে সব বৈশিষ্ট্য বর্ণিত হয়েছে এ হাদীসগুলোতেই তাই বলা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.), হযরত আবুদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.), হযরত আনাস ইবনে মালিক (রা.), হযরত আয়েশা (রা.), মুজাহিদ ও আবুল আলীয়ার উক্তিসমূহ মুসনাদে আহমাদ, বুখারী, তিরমিযী, নাসাঈ, ইবনে মারদুইয়া, ইবনে জারীর ও ইবনে আবী শাইবা ইত্যাদি মুহাদ্দিসগণের কিতাবে উল্লেখিত হয়েছে।
ফী জিলালিল কুরআন:
সূরার প্রথম আয়াতেই রসূলুল্লাহ (স.)-কে সম্বোধন করে এরশাদ হচ্ছে, ‘অবশ্যই আমি তোমাকে কাওসার দান করেছি ।’ “কাওসার” শব্দটি আরবী ‘কাসরাত’ শব্দ থেকে উদ্ভূত । এর অর্থ হলো, অধিকতর, পর্যাপ্ত, অনন্ত ও সীমাহীন ৷ কোরায়শ সম্প্রদায়ের দুষ্ট প্রকৃতির লোকেরা প্রিয় রসূলকে ‘আবতার’ বলে বিদ্রুপ করেছে। আল্লাহ তায়ালা এর বিপরীত শব্দ ‘কাওসার’ ব্যবহার করেছেন। আল্লাহ তায়ালা দুষ্কৃতকারীদেরকে লক্ষ্য করে বলছেন- আমার হাবীব ‘আবতার’ বা ‘শেকড়হীন’ আটকুঁড়ে নন, বরং আমি তাকে পর্যাপ্ত, অধিক, অসীম, অন্তহীন নেয়ামত প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি। যে কোনো মানুষ মুক্ত ও উদার দৃষ্টি ও মন নিয়ে এই অন্তহীন নেয়ামতকে বুঝাতে চাইলে, সে তার দৃষ্টিকে নিবদ্ধ করলে সেই অন্তহীন প্রাচুর্যকে স্বচক্ষে অবলোকন করতে পারে। সন্ধানী ব্যক্তি তার দৃষ্টি যেদিকেই নিবদ্ধ করুক না কেন, আল্লাহর এ প্রাচুর্য ও অন্তহীন অনুগ্রহ তার চোখে ধরা পড়বেই। কাওসার এর ব্যাখ্যা : আল্লাহ তায়ালা তার হাবীবকে রেসালাত ও নবুওতের আসনে অধিষ্ঠিত করে অন্তহীন নেয়ামত দান করেছেন। সীমাহীন সম্মান ও মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছেন৷ তারা রসূল (স.) সম্পর্কে অত্যন্ত জঘন্য ভাষায় ঠাট্টা বিদ্রুপ করতো। আল্লাহ প্রদত্ত সত্য দ্বীন থেকে গণমানুষকে বিচ্ছিন্ন ও সম্পর্কহীন রাখার হীন উদ্দেশ্যেই তারা এ সকল মিথ্যা প্রচারণায় লিপ্ত হতো । কোরায়শ সম্প্রদায়ের দূরাচারদের মধ্যে ইবনে ওয়ালিদ, উকবাহ বিন আবি মু’য়ীত, আবু লাহাব, আবু জাহল প্রমুখ ছিলো সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য ৷ প্রিয় নবী (স.)-এর পুত্র সন্তানরা শিশুকালেই মৃত্যু বরণের কারণে ওরা বলতো, ওকে নিয়ে ভাববার কারণ নেই, ওতো শেকড়হীন, আটকুঁড়ে । ওদের মধ্য থেকে একজন বললো, ওর প্রসংগই বাদ দাও, ওর সম্পর্ক বর্জন করো, ওতো শেষ হয়ে যাবে নির্বংশ হয়ে যাবে, ওর কোনো পুত্র সন্তান বেঁচে না থাকার কারণে ওর মৃত্যুর সাথে সাথেই ওর সব ব্যাপার চুকে যাবে। তারা তাদের মধ্যেকার এক ব্যক্তি অধিক সন্তানের পিতা হওয়ার কারণে তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিলো এবং তাকে পরম সৌভাগ্যবান ও সম্মানিত মনে করতো । রসূলুল্লাহ (স.)-এর শত্রুরা রসূলের পুত্র সম্তান শিশু বয়সেই মৃত্যুবরণ করায় মনে করতো রসূলুল্লাহ (স.)-এর শত্রুরা রসূলের পুত্র সন্তান শিশু বয়সেই মৃত্যুবরণ করায় তার প্রতি বিভিন্ন ধরনের ঠাট্টাবিদ্রূপ করার কারণে স্বভাবতই তিনি মানসিকভাবে উদ্বিগ্ন ও দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ছিলেন । এরই প্রেক্ষিতে আল্লাহ তায়ালা, তার প্রিয় হাবীবকে আশ্বস্ত ও সান্ত্বনা প্রদানের মাধ্যমে নবুওত ও রেসালাতের মর্যাদা ও সম্মান দান করেছেন। জানাচ্ছেন এর থেকে অধিকতর নেয়ামত আর কী হতে পারে? এর চেয়ে উচ্চতর সম্মান ও ইযযত আর কী হতে পারে? আল্লাহ প্রদত্ত এ মর্যাদাকে ও সম্মানের সমকক্ষ কি আর কিছু হতে পারে? এর চেয়ে অতুলনীয় ও অনুপম নেয়ামত আর কিছু কি হতে পারে? সে তো সব কিছুই পেয়ে যায় যে আল্লাহর এই মহান অতুলনীয় নেয়ামতের অধিকারী হয়। রসূলকে ‘কাওসার’ প্রদানের আর এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হলো আল কোরআন । আল্লাহ্ তায়ালার পক্ষ থেকে অবতীর্ণ কোরআন রসূলের প্রতি, আর রসূলের মাধ্যমে গোটা মানবতার প্রতি আল্লাহর অফুরন্ত নেয়ামত । অসীম জ্ঞানের উৎস আল কোরআন রসূল (স.)-কে প্রাচুর্য প্রদানের এক মহান নিদর্শন। আল কোরআনের ঝর্ণা ধারা শান্তি ও কল্যাণের অন্তহীন উৎস । গোটা কোরআন তো এক অনন্ত নেয়ামত, শুধু সূরা কাওসারইতো অন্তহীন নেয়ামতের মুর্ত প্রতীক । যার আধিক্য ও প্রাচূর্যের পরিসমাপ্তি নেই। এই সূরা কাওসার-এর মাধ্যমে রসূলের প্রতি, মানবতার প্রতি সীমাহীন রহমত ও অনুগ্রহের ঝর্ণাধারা উৎসারিত ও প্রবাহিত হওয়ার কথা চুড়ান্তভাবে ঘোষণা করা হয়েছে। এ মাধুর্য ও এর প্রবাহের কোনো শেষ নেই। রসূলকে প্রাচুর্য, অধিক্য, অন্তহীন নেয়ামত ও মর্যাদা প্রদানের আরেক সুস্পষ্ট প্রমাণ হচ্ছে ‘কালেমা’ ও আযানের বাক্যে রসূলের প্রিয় নাম সংযুক্ত করা। এ বিশ্ব জাহানের প্রতিটি ভূখন্ডে মহান আল্লাহর নামের সাথে রসূল (স.)-এর নাম উচ্চারিত হয়। দেশে দেশে আল্লাহর নামের সাথে রসূলের নাম উচ্চারিত হয়। আল্লাহর প্রতি ঈমানের সাথে, রসূলের প্রতি ঈমান আনয়নের মাধ্যমে কোটি কোটি মানুষ ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করে। রসূলের প্রতি ফেরেশতাকুল স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা ও সমগ্র মুসলিম উম্মাহ নামায ও দুরূদ পাঠ করে। দিগন্ত বিস্তৃত নীলাকাশে বায়ু তরংগের তালে তালে যখন আযানের ধ্বনি ধ্বনিত হয় তখন প্রতিটি মুহূর্তে বিশ্বের প্রতিটি ভুখন্ডে উচ্চস্বরে উচ্চারিত ও ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হয়- এ প্রিয় নাম। যুগে যুগে বিশ্বের সর্বত্র তার প্রতিষ্ঠিত আদর্শের পয়গাম কোটি কোটি মানুষের মুখে উচ্চারিত হয়। তাদের অন্তরের বিশ্বাসের মাধ্যমে এ প্রাচুর্যের প্রমাণ খুঁজে পাওয়া যায় । কোটি কোটি মানুষের মুখে এ প্রিয় নামের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষিত হয়। অগণিত দার্শনিক, ঐতিহাসিক, চিন্তাবিদ তার শ্রেষ্ঠত্ব ও মহত্ত্বের স্বীকৃতি ঘোষণায় পঞ্চমুখ ৷ যুগযুগান্তরে তার মহব্বতে অগণিত মানুষ জীবন দানের জন্য প্রস্তুত রয়েছে এবং কেয়ামত পর্যন্ত এ নামের প্রশংসা, তার শ্রেষ্ঠত্ব ও মহত্ত্বের ঘোষণা ও স্বীকৃতি অব্যাহত থাকবে । মানব সভ্যতার প্রতি তার অবদান অনন্তকাল পর্যন্ত অব্যাহত থাকা তার প্রতি আধিক্য ও প্রাচুর্য প্রদানের আর একটি প্রকৃষ্ট প্রমাণ । তারই প্রদর্শিত পথে মানব জাতির চিরন্তন কল্যাণ ও শান্তি নিহিত রয়েছে। সকল যুগে সকল দেশের সকল যুগের মানুষ যারা তার আদর্শকে একমাত্র নিখুঁত ও নির্ভুল আদর্শ হিসাবে উপলব্ধি করতে পারে, তার এ আদর্শের প্রতি ঈমান আনার মাধ্যমে তার শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ প্রদান করে। অনেক মানুষ অজ্ঞাতসারেই তার প্রতিষ্ঠিত আদর্শের কল্যাণ ও উপকারিতা উপভোগ করে। বিভিন্ন রূপে বিভিন্নভাবে সংখ্যাগরিষ্ট ও সংখ্যালঘু সবাই তার অন্তহীন কল্যাণের উৎসারিত ঝর্ণাধারা থেকে তৃষ্ণা নিবারণ করছে। রসূলুল্লাহকে আল্লাহ তায়ালা যে অন্তহীন কল্যাণ উপহার দিয়েছেন তা অফুরন্ত, তা কোনদিন নিঃশেষ হয়ে যাবেনা । যুগে যুগে এ কল্যাণের ধারা আরও বৃদ্ধি পাবে, আরও সম্প্রসারিত হবে৷ এ জন্য আল কোরআনে রসূলুল্লাহ (স.)-কে প্রাচুর্য ও অন্তহীন নেয়ামত প্রদানের সুস্পষ্ট ঘোষণা দেয়া হয়েছে। এমন আধিক্য, এমন প্রাচুর্য, এত সম্মান ও মর্যাদা নবী করীম (স.)-কে দেয়া হয়েছে যার কোনো সীমা নেই৷ তার পরিচিতিরও কোনো পরিসীমা নেই, যার কোনো পরিসংখ্যান করা যায়না । যার আদর্শ অনুসরণের মধ্যে মানুষের জীবনে কল্যাণের অফুরন্ত ফল্গুধারা প্রবাহিত ও বর্ধিত হয়। এছাড়া ‘কাওসার’ প্রদানের সুসংবাদ প্রসংগে বিভিন্ন সূত্রে হাদীসে এমন অনেক রেওয়ায়াত রয়েছে যেগুলোতে বলা হয়েছে, জান্নাতে একটি নহর রয়েছে যা রসুলুল্লাহ (স.) কে উপহার দেয়া হবে। আবদুল্লাহ্ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, এ নহর ও ঝর্ণাধারা প্রভূত কল্যাণের মধ্যস্থলে অবস্থিত । এ হাউযটি অনেক হাউযের মধ্যে একটি হাউয এবং হাউযটির কর্তৃত্ব রসূলে করীম (স.)-এর নিকট অর্পিত হবে। এ প্রসংগে এ ব্যাখ্যা সর্বাধিক গ্রহণ যোগ্য । বলা হচ্ছে, নামায আদায় করুন ও কোরবানী দিন।
সুরা: আল-কাউসার
আয়াত নং :-2
টিকা নং:2,
فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَ انْحَرْؕ
কাজেই তুমি নিজের রবেরই জন্য নামায পড়ো ও কুরবানী করো।২
তাফসীর :
তাফহীমুল কুরআন:
টিকা:২) বিভিন্ন মনীষী এর বিভিন্ন ব্যাখ্যা করেছেন। কেউ কেউ নামায বলতে পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামায ধরেছেন। কেউ ঈদুল আযহার নামায মনে করেছেন। আবার কেউ বলেছেন, এখানে নিছক নামাযের কথা বলা হয়েছে। অনুরূপভাবে “ওয়ানহার” অর্থাৎ “নহর কর” শব্দেরও কোন কোন বিপুল মর্যাদার অধিকারী মনীষী অর্থ করেছেন, নামাযে বাম হাতের ওপর ডান হাত রেখে তা বুকে বাঁধা। কেউ কেউ বলেছেন, এর অর্থ হচ্ছে, নামায শুরু করার সময় দুই হাত ওপরে উঠিয়ে তাকবীর বলা, কেউ কেউ বলেছেন, এর মাধ্যমে নামায শুরু করার সময় রুকূ’তে যাবার সময় এবং রুকূ’ থেকে উঠে রাফে ইয়াদায়েন করা বুঝানো হয়েছে। আবার কেউ কেউ বলেছেন, এর অর্থ হচ্ছে, ঈদুল আযহার নামায পড়া এবং কুরবানী করা। কিন্তু যে পরিবেশ ও পরিস্থিতিতে এ হুকুম দেয়া হয়েছে সে সম্পর্কে চিন্তা করলে এর সুস্পষ্ট অর্থ এই মনে হয়ঃ “হে নবী! তোমার রব যখন তোমাকে এত বিপুল কল্যাণ দান করেছেন তখন তুমি তাঁরই জন্য নামায পড় এবং তাঁরই জন্য কুরবানী দাও।” এ হুকুমটি এমন এক পরিবেশে দেয়া হয়েছিল যখন কেবল কুরাইশ বংশীয় মুশরিকরাই নয় সমগ্র আরব দেশের মুশরিকবৃন্দ নিজেদের মনগড়া মাবুদদের পূজা করতো এবং তাদের আস্তানায় পশু বলী দিতো। কাজেই এখানে এ হুকুমে
র উদ্দেশ্য হচ্ছে, মুশরিকদের বিপরীতে তোমরা নিজেদের কর্মনীতির ওপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকো। অর্থাৎ তোমাদের নামায হবে আল্লাহরই জন্য, কুরবানীও হবে তাঁরই জন্য। যেমন অন্যত্র বলা হয়েছেঃ قُلْ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ – لَا شَرِيكَ لَهُ وَبِذَلِكَ أُمِرْتُ وَأَنَا أَوَّلُ الْمُسْلِمِينَ
“হে নবী! বলে দাও, আমার নামায, আমার কুরবানী, আমার জীবন ও আমার মৃত্যু বিশ্ব-জাহানের রব আল্লাহরই জন্য। তাঁর কোন শরীক নেই। আমাকে এরই হুকুম দেয়া হয়েছে এবং আমি সর্বপ্রথম আনুগত্যের শির নত করি।” (আল আন’আম, ১৬২-১৬৩ )। ইবনে আব্বাস আতা, মুজাহিদ, ইকরামা, হাসান বসরী, কাতাদাহ, মুহাম্মাদ ইবনে কাব আল কুয়াযী, যাহহাক, রাবী’ইবনে আনাস, আতাউল খোরাসানী এবং আরো অন্যান্য অনেক নেতৃস্থানীয় মুফাস্সির এর এ অর্থই বর্ণনা করেছেন (ইবনে কাসীর)। তবে একথা যথাস্থানে পুরোপুরি সত্য যে, রসূলুল্লাহ (সা.) যখন মদীনা তাইয়েবায় আল্লাহর হুকুমে ঈদুল আযহার নামায পড়েন ও কুরবানীর প্রচলন করেন তখন যেহেতু إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي আয়াতে এবং فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ আয়াতে নামাযকে প্রথমে ও কুরবানীকে পরে রাখা হয়েছে তাই তিনি নিজেও এভাবেই করেন এবং মুসলমানদের এভাবে করার হুকুম দেন। অর্থাৎ এদিন প্রথমে নামায পড়বে এবং তারপর কুরবানী দেবে। এটি এ আয়াতের ব্যাখ্যা বা এর শানে নুযুল নয়। বরং সংশ্লিষ্ট আয়াতগুলো থেকে রসূলুল্লাহ ﷺ এ বিধানটি ইসতেমবাত তথা উদ্ভাবন করেছিলেন। আর রসূলের ﷺ ইসতেমবাতও এক ধরনের ওহী।
ফী জিলালিল কুরআন:
ইবাদত ও উৎসর্গ : রসূলুল্লাহ (স.)-কে অত্যধিক পরিমাণ নেয়ামত ও মর্যাদা দানের আশ্বাস ও নিশ্চয়তা প্রদানের পর পরবর্তী এ আয়াতে চক্রান্তকারীদের সকল ষড়যন্ত্রকে ব্যর্থ করে দিয়ে রসূলের প্রতি অনুগ্রহ, মর্যাদা ও সম্মান প্রদানের কথা ঘোষণা হয়েছে৷ বিনিময়ে আল্লাহর শোকরিয়া ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের নিমিত্তে আল্লাহর এবাদাত ও আল্লাহর উদ্দেশ্যে ত্যাগ ও কোরবানীর নির্দেশ দেয়া হয়েছে। নিষ্ঠা ও একাগ্রচিত্তে এবং নির্জনে আল্লাহর এবাদাতে মশগুল হতে বলা হয়েছে । আল্লাহর সাথে গভীর সম্পর্ক সৃষ্টি, দীনতা, হীনতা ও বিনয় প্রকাশের জন্য একাগ্রচিত্তে নামায আদায় করতে ও একমাত্র আল্লাহরই সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে ত্যাগ ও কোরবানী করার আদেশ প্রদান করা হয়েছে। আল্লাহর রেযামন্দির উদ্দেশ্যে মোশরেকদের সকল পদ্ধতি পরিহার করে, শেরেকমুক্ত ভাবে পূর্ণ নিষ্ঠার সাথে নামায আদায়, যবাই বা কোরবানীর সময় গায়রুল্লাহ নামে, দেবদেবীর নামে বলিদানপ্রথাবর্জন করে জীবজন্তু একমাত্র আল্লাহরই নামে কোরবানী ও যবাই করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আর আয়াতে দুটো নির্দেশের পুনরুল্লেখের মাধ্যমে একমাত্র সকল এবাদাত আল্লাহরই উদ্দেশ্যে নিবেদিত করা, এবং একমাত্র আল্লাহর নাম ছাড়া অন্য কারো নামে যবাই না করা, আল্লাহ তায়ালা ছাড়া অপর কারো নামে যবাই করা প্রাণী নিষিদ্ধ হওয়াই প্রমানিত হয়েছে। আয়াত থেকে এমর্মে ও এ শিক্ষাই আমরা খুঁজে পাই যে, শেরেকের সংমিশ্রণ ও প্রভাবমুক্ত অকৃত্রিম নিরেট ও খালেস তাওহীদ একমাত্র ইসলামী জীবন দর্শনেই নিহিত রয়েছে। তাদের শুধু কল্পনা ও অনুভূতি নয়, শব্দ ও তত্ত্বের মধ্যেই নয় বরং সমগ্র জীবনধারায় তাওহীদের মুর্ত প্রকাশ, জীবনের প্রতিটি পরতে পরতে দিবালোকের মতো নির্ভেজাল ও অকৃত্রিম তাওহীদের অমলিন জ্যোতি একমাত্র দ্বীন ইসলামের মধ্যেই পাওয়া যায় । মানব জীবনের বিশ্বাস ও বাস্তব জীবনের প্রতিটি কর্মধারায়, শাখা প্রশাখা ছত্র ছায়ায় সর্বত্রই সুস্পষ্ট পরিচ্ছন্ন, নির্ভেজাল, খাটি তাওহীদ বা একত্ববাদ একমাত্র ইসলামের মধ্যেই নিহিত রয়েছে। ইসলাম ছাড়া বিশ্বের যতো মতাদর্শ রয়েছে তার কোনোটাই শেরেকমুক্ত নয়। ইসলাম ব্যতিত অপর সকল ধর্ম, দর্শন ও মতবাদের আগা গোড়া শেরেক বিজড়িত ৷ অপর মতবাদের ভিতর বাইর, প্রকাশ্য গোপন, সকল ক্ষেত্র শেরেক দ্বারা আচ্ছাদিত । অপর সকল মতাদর্শই নাস্তিক্যবাদ, জড়বাদ, পৌত্তলিকতাবাদ, নিরেশ্বরবাদ, সর্বেশ্বরবাদ ও সন্দেহবাদে পরিপূর্ণ । একটি মুহূর্তের জন্যেও সে সকল মতাদর্শে খাটি তাওহীদের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাবে না। এক কানাকড়ি নির্ভেজাল তাওহীদের সন্ধান ও সে সকল মতাদর্শে পাওয়া যাবে না। সে সকল ধর্ম ও মতাদর্শে, তার জীবনাচরণে, পূজা-অর্চনা ও উপাসনায় কোথাও খালেস তাওহীদের লেশমাত্র নেই৷ তাওহীদ যেমনি অবিচ্ছিন্ন অংশীদারিত্বহীন এক ও একক সত্ত্বা, তেমনি ইসলাম একমাত্র অবিচ্ছিন্ন এক পরিপূর্ণ জীবন পদ্ধতি, জীবনের ছোটখাট খুটিনাটি ব্যাপারে খাটি নির্ভেজাল তাওহীদের বৈশিষ্ট্যকে অক্ষুন্ন রাখে, যেমনি ভাবে আমি প্রাণী যবাই ও কোরবানীর ক্ষেত্রে, এবাদাত ও জীবন বোধে, আচরণে এবাদাতে সর্বত্র এই তাওহীদের প্রভাব সুস্পষ্টভাবে দেখতে পাই।
সুরা: আল-কাউসার
আয়াত নং :-3
টিকা নং:3, 4,
اِنَّ شَانِئَكَ هُوَ الْاَبْتَرُ۠
নিশ্চয়ই তোমার দুশমনই৩ শিকড় কাটা।৪
তাফসীর :
তাফহীমুল কুরআন:
টিকা:৩) এখানে شَانِئَكَ (শা-নিআকা) শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। এর মূল হচ্ছে شنء (শানউন)। এর মানে এমন ধরনের বিদ্বেষ ও শত্রুতা যে কারণে একজন অন্য জনের বিরুদ্ধে অসদ্ব্যবহার করতে থাকে। কুরআন মজীদের অন্য জায়গায় বলা হয়েছেঃ وَلَا يَجْرِمَنَّكُمْ شَنَآنُ قَوْمٍ عَلَى أَلَّا تَعْدِلُوا “আর হে মুসলমানরা! কোন দলের প্রতি শত্রুতা তোমাদের যেন কোন বাড়াবাড়ি করতে উদ্বুদ্ধ না করে যার ফলে তোমরা ইনসাফ করতে সক্ষম না হও।” কাজেই এখানে “শানিয়াকা” বলে এমন প্রত্যেক ব্যক্তিকে বুঝানো হয়েছে যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শত্রুতায় অন্ধ হওয়া তাঁর প্রতিও দোষারোপ করে, তাঁকে গালিগালাজ করে, তাঁকে অবমাননা করে এবং তাঁর বিরুদ্ধে নানান ধরনের অপবাদ দিয়ে নিজের মনের ঝাল মেটায়।
টিকা:৪) هُوَ الْأَبْتَرُ “সেই আবতার” বলা হয়েছে। অর্থাৎ সে তোমাকে আবতার বলে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সে নিজেই আবতার। আমি ইতিপূর্বে এ সূরার ভূমিকায় “আবতার” শব্দের কিছু ব্যাখ্যা দিয়েছি। এই শব্দের মূলে রয়েছে বাতারা (بتر) এর মানে কাটা। কিন্তু এর পরিভাষিক অর্থ অত্যন্ত ব্যাপক। হাদীসে নামাযের যে রাকাতের সাথে অন্য কোন রাকাত পড়া হয় না তাকে বুতাইরা (بتيراء) বলা হয়। অর্থাৎ একক রাকাত। অন্য একটি হাদীসে বলা হয়েছেঃ
كُلُّ أَمْرٍ ذِى بَالٍ لاَ يُبْدَأُ فِيهِ بِالْحَمْدِ الله فهو ابتر
“যেকোন গুরুত্বপূর্ণ কাজ আল্লাহর প্রসংশাবাণী উচ্চারণ না করে শুরু করাটা আবতার।”
অর্থাৎ তার শিকড় কাটা গেছে। সে কোন প্রতিষ্ঠা ও শক্তিমত্তা লাভ করতে পারে না। অথবা তার পরিণাম ভালো নয়। ব্যর্থ কাম ব্যক্তিকেও আবতার বলা হয়। যে ব্যক্তির কোন উপকার ও কল্যাণের আশা নেই এবং যার সাফল্যের সব আশা নির্মূল হয়ে গেছে তাকেও আবতার বলে। যার কোন ছেলে সন্তান নেই অথবা হয়ে মারা গেছে তার ব্যাপারেও আবতার শব্দ ব্যবহার করা হয়ে থাকে। কারণ তার অবর্তমানে তার নাম নেবার মতো কেউ থাকে না এবং মারা যাবার পর তার নাম নিশানা মুছে যার। প্রায় সমস্ত অর্থেই কুরাইশ কাফেররা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আবতার বলতো। তার জবাবে আল্লাহ বলেন, হে নবী! তুমি আবতার নও বরং তোমার এ শত্রুই আবতার। এটা নিছক কোন জবাবী আক্রমণ ছিল না। বরং এটা ছিল আসলে কুরআনের বড় বড় গুরুত্বপূর্ণ ভবিষ্যদ্বাণীর মধ্য থেকে একটি বড়ই গুরুত্বপূর্ণ ভবিষ্যদ্বাণী। এটা অক্ষরে অক্ষরে সত্য প্রমাণিত হয়। যখন এ ভবিষ্যদ্বাণী করা হয় তখন লোকেরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আবতার মনে করতো। তখন কেউ ধরণা করতে পারতো না যে, কুরাইশদের এ বড় বড় সরদাররা আবার কেমন করে আবতার হয়ে যাবে? তারা কেবল মক্কায়ই নয় সমগ্র দেশে খ্যাতিমান ছিল। তারা সফলকাম ছিল। তারা কেবল ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততির অধিকারী ছিল না বরং সারা দেশে বিভিন্ন জায়গায় ছিল তাদের সহযোগী ও সাহায্যকারী দল। ব্যবসার ইজারাদার ও হজ্জের ব্যবস্থাপক হবার কারণে আরবের সকল গোত্রের সাথে ছিল তাদের সম্পর্ক। কিন্তু কয়েক বছর যেতে না যেতেই অবস্থা সম্পূর্ণ বদলে গেলো। হিজরী ৫ সনে আহযাব যুদ্ধের সময় কুরাইশরা বহু আরব ও ইহুদি গোত্র নিয়ে মদীনা আক্রমণ করলো এবং রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে অবরুদ্ধ অবস্থায় শহরের চারদিক পরিখা খনন করে প্রতিরক্ষার লড়াইয়ে লিপ্ত হতে হলো। কিন্তু এর মাত্র তিন বছর পরে ৮ হিজরীতে রসূলুল্লাহ ﷺ যখন মক্কা আক্রমণ করলেন তখন কুরাইশদের কোন সাহায্য-সহযোগিতা দানকারী ছিল না। নিতান্ত অসহায়ের মতো তাদেরকে অস্ত্র সংবরণ করতে হলো। এরপর এক বছরের মধ্যে সমগ্র আরব দেশ ছিল রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের করতলগত। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে বিভিন্ন গোত্রের প্রতিনিধিদল এসে তাঁর হাতে বাই’আত হচ্ছিল। ওদিকে তাঁর শত্রুরা সম্পূর্ণরূপে বন্ধু-বান্ধব ও সাহায্য-সহায়হীন হয়ে পড়েছিল। তারপর তাদের নাম-নিশানা দুনিয়ার বুক থেকে এমনভাবে মুছে গেলো যে, তাদের সন্তানদের কেউ আজ বেঁচে থাকলেও তাদের কেউই আজ জানে না সে আবু জেহেল আর আবু লাহাব, আস ইবনে ওয়ায়েল বা উকবা ইবনে আবীমু’আইত ইত্যাদি ইসলামের শত্রুদের সন্তান। আর কেউ জানলেও সে নিজেকে এদের সন্তান বলে পরিচয় দিতে প্রস্তুত নয়। বিপরীতপক্ষে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পরিবারবর্গের ওপর আজ সারা দুনিয়ায় দরূদ পড়া হচ্ছে। কোটি কোটি মুসলমান তাঁর সাথে সম্পর্কিত হবার কারণে গর্ব করে। লাখো লাখো লোক তাঁর সাথেই নয় বরং তাঁর পরিবার-পরিজন এমন কি তাঁর সাথীদের পরিবার-পরিজনের সাথেও সম্পর্কিত হওয়াকে গৌরবজনক মনে করে। এখানে কেউ সাইয়েদ, কেউ উলুব্বী, কেউ আব্বাসী, কেউ হাশেমী, কেউ সিদ্দিকী, কেউ ফারুকী, কেউ উসমানী, কেউ যুবাইরী এবং কেউ আনসারী। কিন্তু নামমাত্রও কোন আবু জেহেলী বা আবু লাহাবী পাওয়া যায় না। ইতিহাস প্রমাণ করেছে, রসূলুল্লাহ ﷺ আবতার নন বরং তাঁর শত্রুরাই আবতার।
ফী জিলালিল কুরআন:
দীনের শত্রুরা সাবধান : ‘আর তোমার শত্রুরাই শিকড়কাটা’। পূর্ববর্তী আয়াতে আল্লাহ তায়ালা তাঁর প্রিয় হাবীবকে আশ্বস্ত ও সাত্ত্বনা দিয়ে অত্যধিক মর্যাদা সম্মান তথা কাওসার প্রদানের সুসংবাদ দিয়েছেন। আর সর্বশেষ আয়াতে বলা হয়েছে, তুমি শেকড়-কাটা নও, বরং তোমার প্রতি যাদের অন্তরে ঈর্ষা, হিংসা ও বিদ্বেষের দাবানল দাউ দাউ করে জ্বলছে তোমার সে সকল শত্রুরাই প্রকৃতপক্ষে শিকড়কাটা ও আটকুঁড়ে ৷ আল্লাহ তায়ালার এ অভিশাপ ও সতর্কবাণী রসূলের শত্রুদের ক্ষেত্রে অক্ষরে অক্ষরে সত্যে পরিণত হয়েছিলো। আজ ইতিহাসে তাদের নাম-নিশানাও নেই। গোটা মক্কা ও মদীনায় একজন পৌত্তলিক ও শিরিকবাদীর নাম নিশানা আজ আর অবশিষ্ট নেই। আর আমরা আজও কোটি কোটি মানুষ প্রিয়নবী মোহাম্মাদ (স.)-এর আদর্শের অনুসরণ করে আল্লাহ তায়ালার ঘোষিত মর্যাদা ও সম্মানের পতাকাকে সমুন্নত রেখেছি। আমরা আজ রসূলের আদর্শের পতাকা বহন করে আল্লাহর ঘোষিত বাণীর সত্যতা প্রদান করছি। যুগে যুগে ইসলামের শত্রুরা পর্যুদস্ত, পরাস্ত ও নিশ্চিহ্ন হয়েছে। রসূলের যুগে বদর, হোনায়ন, আহযাব এবং ফতহে মক্কায় তাদের পরাজয়ের মাধ্যমে কোরআন অস্বীকারকারী বাতিল পন্থী রসূলের সেই দুশমনদের ‘আবতার”- শেকড়হীন, পরাজিত ও পরাস্ত হওয়ার চিরন্তন বাণীই ঐতিহাসিক সত্যের আলোকে স্পষ্ট, স্বচ্ছ, সমুজ্জল, ভাস্বর ও সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে। আল্লাহর লাঠি, আল্লাহর মার, আল্লাহর অন্ত্র- মানুষের লাঠি, মার ও অস্ত্র থেকে ভিন্নতর ৷ কিন্তু ধোঁকাবাজি ও প্রতারণায় নিমজ্জিত ব্যক্তিরা তাদের উদ্যোগকে চূড়ান্ত মনে করে এবং তারা তাদের অস্ত্র শক্তিকেই প্রকৃত বলে মনে করে। অথচ আমাদের সামনে আল্লাহর এ চিরন্তন বাণীর সত্যতা সুস্পষ্টভাবে ধরা দিচ্ছে যে, মোহাম্মাদ (স.)-এর শত্রুরাই নিপাত, নিশ্চিহ্ন ও নির্বংশ হয়েছে। আল্লাহর চিরস্থায়ী বাণী ইতিহাসের পাতায় স্পষ্ট দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। আজ আমাদের ভেবে দেখা প্রয়োজন, আজ কোথায় সে সব লোকেরা যারা রসূলে পাক (স.) সম্পর্কে কটুক্তি করেছিলো, যারা অপবাদ ও অপপ্রচারে লিপ্ত ছিলো? যারা আল্লাহর রসূল থেকে জনগণকে বিচ্ছিন্ন রাখতে চেয়েছিলো, যারা জনমতকে বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টায় লিপ্ত ছিলো, তারা আজ কোথায়? তারা আজ কোথায়? যারা মনে করতো আল্লাহর রসূলের ওপর তারা কাবু পেয়ে গেছে, তারা রসূল (স.)-কে গণবিচ্ছিন্ন করতে সমর্থ হয়েছে! ইতিহাস বলে দাও, আজ কোথায় তারা? কোথায় তাদের স্মৃতি? কোথায় তাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও প্রভাব? আল্লাহপ্রদত্ত কাওসারের প্লাবন তাদেরকে কোন সুদূরে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে? কাওসারের মালিক মোহাম্মাদ (স.)-এর সে প্রতিবেশীরা আজ ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছে; যারা বলতো মুহাম্মাদ (স.) নির্মূল ও আটকুঁড়ে ৷ আল্লাহর দ্বীনের দাওয়াত, সত্যের দাওয়াত, কল্যাণ ও মুক্তির দাওয়াতকে কোনো শক্তিই নির্মূল করতে পারেনা, পারে না তাকে নিশ্চিহ্ন করতে, পারে না কখনও ধ্বংস করতে । কোনো দিন কোনো শক্তি আল্লাহর দ্বীনের দায়ীকে, আল্লাহর কালেমাকে বুলন্দ করার সংগ্রামে নিয়োজিত ব্যক্তি ও সংগঠনকে নিশ্চিহ্ন ও নির্মূল করতে পারে না। এ সুরা ইতিহাসের অসংখ্য ঘটনা ও প্রমাণের ভিত্তিতে এ মহাসত্যকেই তুলে ধরেছে। কি করে পারবে? আল্লাহর দ্বীনের দাওয়াত ও দায়ী ইলাল্লাহকে নিশ্চিহ্ন ও নির্মূল করতে। যে আল্লাহর দেয়া এ দ্বীন তিনিতো চিরন্তন সত্য ৷ তিনি চিরজীবী, চিরস্থায়ী, অনন্ত, অসীম, পরম পরাক্রমশালী ও মহাশক্তিমান। নিশ্চয়ই নিশ্চিহ্ন, নির্মূল, পরাস্ত, পর্যুদস্ত, পরাভূত ও দূরীভূত হবে বাতিল। পরাজিত হবে মিথ্যাশ্রয়ী ও বাতিলপন্থীরা ৷ ইতিহাসের কোনো স্তরে, কোনো পর্যায়ে, কোনো যুগে কি মিথ্যাশ্রয়ী ও বাতিলপন্থীরা জয়ী হয়েছে? না, সকল যুগেই আল্লাহর বাণী সত্য প্রমাণিত হয়েছে। আল্লাহ তায়ালার বাণীই তো চিরন্তন সত্য; আর মিথ্যাশ্রয়ী চক্ররান্তকারীদের ষড়যন্ত্র চিরদিন মিথ্যাই প্রমাণিত হয়েছে।
# তাফসীরে ফাতহুল মাজিদ:-
নামকরণ:
সূরার প্রথম আয়াতে উল্লিখিত الكوثر কাউসার শব্দ থেকেই কাউসার নামে সূরার নামকরণ করা হয়েছে। এছাড়া এ সূরাকে সূরা নাহারও বলা হয়। কাউসার দ্বারা উদ্দেশ্য হল হাউজে কাউসার, যা কিয়ামতের মাঠে রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-কে প্রদান করা হবে।
শানে নুযূল:
আনাস বিন মালেক (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন : একদা রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কিছুক্ষণ তন্দ্রাচ্ছন্ন ছিলেন। হঠাৎ মাথা তুলে হাসিমুখে বললেন অথবা তাঁর হাসির কারণ জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বললেন: এইমাত্র আমার ওপর একটি সূরা অবতীর্ণ হয়েছে। তারপর তিনি বিসমিল্লাহ বলে সূরা কাউসার পাঠ করলেন। অতঃপর তিনি বললেন: কাউসার কী তোমরা জান? জবাবে সাহাবাগণ বললেন: আল্লাহ তা‘আলা ও তাঁর রাসূলই ভাল জানেন। তিনি বললেন: কাউসার হলো : জান্নাতে একটি নহর আল্লাহ তা‘আলা আমাকে দান করেছেন, তাতে বহু কল্যাণ নিহিত রয়েছে। (আহমাদ ৩/১০২, সনদ সহীহ) আল্লাহ তা‘আলা নাবী (সাঃ)-কে কাউসার দান করেছেন। এ কাউসার দ্বারা উদ্দেশ্য কী তা নিয়ে আলেম সমাজে মতামত রয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম দু’টি হলো:
১. কাউসার দ্বারা জান্নাতের নহর উদ্দেশ্য। আয়িশাহ (রাঃ) কে
(إِنَّآ أَعْطَيْنٰكَ الْكَوْثَرَ)
আয়াতটি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলো, তিনি জবাবে বলেন : কাউসার হলো জান্নাতের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত একটি নহর যা তোমাদের নাবী (সাঃ)-কে প্রদান করা হয়েছে। (সহীহ বুখারী হা. ৪৯৬৫)
এ ছাড়াও নাবী (সাঃ) থেকে এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট হাদীস রয়েছে।
২. কাউসার দ্বারা দুনিয়া ও আখিরাতের অনেক কল্যাণকে বুঝানো হয়েছে। আর এ কল্যাণের মাঝে জান্নাতের কাউসার নামক নহরও শামিল। অধিকাংশ আলেম এ কথা বলেছেন। (ইবনু কাসীর, তাফসীর সা‘দী, তাফসীর মুয়াসসার।) আর এটাই সঠিক, কেননা এতে ব্যাপকতা রয়েছে।
জান্নাতের হাউজে কাউসারের বিবরণ:
জান্নাতের হাউজে কাউসার এখনও বিদ্যমান। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন :
وإني والله لأنظر إلي حوض الان
আল্লাহ তা‘আলার শপথ! আমি এখন আমার হাউজ প্রত্যক্ষ করছি। (সহীহ বুখারী হা. ২৪৬১, ৬১৩৭, সহীহ মুসলিম হা. ১৭২৭)
অন্যত্র তিনি বলেন :
ومنبري علي حوضي আমার মিম্বার আমার হাউজে কাউসারের ওপর। (সহীহ বুখারী হা. ১১৮৮, ১১৯৬, সহীহ মুসলিম হা. ১৩৯১)
আল্লামা ইবনু তায়মিয়াহ (রহঃ) তাঁর আক্বীদাহ ওয়াসিতিয়া গ্রন্থে হাউজের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন: হাউজের পানি দুধের চেয়ে সাদা, মধুর চেয়ে মিষ্টি, তার পেয়ালা আকাশের তারকার সংখ্যাতুল্য, যে ব্যক্তি একবার পান করবে পরবর্তীতে কখনও পিপাসার্ত হবে না, এর দৈর্ঘ্য এক মাসের দূরত্বের সমান এবং প্রস্থ এক মাসের দূরত্বের সমান। (আক্বীদাহ ওয়াসিতিয়াহ)
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন : কাউসার হলো একটি নহর যার ওয়াদা আল্লাহ তা‘আলা আমাকে দিয়েছেন। তাতে অনেক কল্যাণ নিহিত রয়েছে। কিয়ামতের দিন আমার উম্মত এ হাউজের নিকটে সমবেত হবে, যার পেয়ালা হবে তারকা সমতুল্য। কিছু লোককে হাউজ থেকে সরিয়ে দেয়া হবে, তখন আমি বলব : হে আমার প্রতিপালক! এরা আমার উম্মত। আল্লাহ তা‘আলা বলবেন : তুমি জান না, তোমার পর তারা কত রকম বিদআত তৈরি করেছে। (সহীহ মুসলিম হা. ২২৯৯, আবূ দাঊদ হা. ৪৭৪৭)
অন্যত্র রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন : মি‘রাজের রাতে আমি জান্নাতে প্রবেশ করলাম। হঠাৎ দেখি যে, আমি একটি নহরের পাশে দণ্ডায়মান যার দুপার্শ্বে মুক্তার তৈরি তাঁবু রয়েছে। তাতে পানি প্রবাহিত হয় তাতে হাত দিয়ে দেখলাম : তা মিশকের মত সুঘ্রাণযুক্ত। জিবরীল (রহঃ)-কে জিজ্ঞাসা করলাম : এটা কী? জবাবে তিনি বললেন : এটা কাউসার যা আল্লাহ তা‘আলা আপনাকে দিয়েছেন। (আহমাদ ৩/২৪৭, সনদ সহীহ।)
(فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ)
অর্থাৎ যেমন আমি তোমাকে দুনিয়া ও আখিরাতে অনেক কল্যাণ দান করেছিÑতার মধ্যে কাউসার অন্যতম একটি তেমন তোমার খালেসভাবে রবের জন্য সালাত ও কুরবানী স¤পন্ন কর, আর তাতে কাউকে অংশী স্থাপন কর না। যেমন আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলছেন:
(قُلْ اِنَّ صَلَاتِیْ وَنُسُکِیْ وَمَحْیَایَ وَمَمَاتِیْ لِلہِ رَبِّ الْعٰلَمِیْنَﯱلَا شَرِیْکَ لَھ۫ﺆ وَبِذٰلِکَ اُمِرْتُ وَاَنَا اَوَّلُ الْمُسْلِمِیْنَ)
“বল : ‘আমার সলাত, আমার কুরবানী, আমার জীবন ও আমার মরণ শুধুমাত্র জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহরই উদ্দেশ্যে।’ ‘তাঁর কোন শরীক নেই এবং আমি এরই জন্য আদিষ্ট হয়েছি এবং আমিই প্রথম মুসলিম।” (সূরা আনআম ৬ : ১৬৩-১৬৪)
وَانْحَرْ — نحر শব্দের প্রকৃত অর্থ উটের কণ্ঠনালীতে বর্শা অথবা ছুরি দিয়ে আঘাত করে জবেহ (নহর) করা ও অন্যান্য পশুকে মাটির ওপর শুইয়ে তার গলায় ছুরি চালানোকে জবেহ বলা হয়। এখানে نحر দ্বারা উদ্দেশ্য কী তা নিয়ে বিভিন্ন বিদ্বান বিভিন্ন বক্তব্য পেশ করেছেন : কেউ বলেছেন সালাতে নহরের নীচে ডান হাতকে বাম হাতের ওপর রাখা। আর কেউ বলেছেনÑতাকবীরে তাহরীমার সময় দুই হাত উত্তোলন করা। আবার কেউ বলেছেনÑকেবলামুখী করে কুরবানী বা নহর করা। (ইবনু জারীর)
সঠিক কথা হলো : نحر দ্বারা উদ্দেশ্য কুরবানীর পশু যদি উট হয় নহর করা আর অন্য পশু হলে জবেহ করা। (ইবনু কাসীর)
এজন্য নাবী (সাঃ) ঈদের সালাত আদায় করে কুরবানীর পশু নহর বা জবেহ করতেন। আর এটাই হলো সুন্নাত। নাবী (সাঃ) বলেন : যারা আমাদের মত সালাত আদায় করল এবং কুরবানী করল তারা সঠিকভাবেই কুরবানী করল। আর যারা সালাতের পূর্বে কুরবানী করেছে তাদের কুরবানী হয়নি (সাধারণ যবেহ করা হলো)। (সহীহ বুখারী হা. ৯৮৩)
আয়াতে যদিও নাবী (সাঃ)-কে সম্বোধন করে বলা হয়েছে, তবে শুধু তার জন্য সীমাবদ্ধ নয় বরং সকলের জন্য এ বিধান প্রযোজ্য। অনেকে এ আয়াত দ্বারা বুঝাতে চান যে, কুরবানী করা ওয়াজিব। আসলে বিষয়টি এমন নয়, বরং কুরবানী অবস্থাভেদে তার হুকুম ভিন্ন হয়ে থাকে, তবে সাধারণ বিধান হল সুন্নাত। এ আয়াত কুরবানী ওয়াজিব হওয়ার নির্দেশ দিচ্ছে না।
(إِنَّ شَانِئَكَ هُوَ الْأَبْتَرُ)
ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন : একদা কা‘ব বিন আশরাফ মক্কায় আগমন করে, তখন কুরাইশরা বলে : আপনি তো তাদের সর্দার, আপনি কি ঐ ছোকরাকে (মুহাম্মাদ) দেখতে পান না? সে তার জাতি থেকে ছিন্ন হয়ে গেছে, আবার নিজেকে শ্রেষ্ঠ দাবী করছে? অথচ আমরা হাজীদের বংশধর, কাবা ঘরের তত্ত্বাবধান এবং যমযম কূপের দেখাশোনা করি। কাব বিন আশরাফ বলেন: তোমরাই শ্রেষ্ঠ। তখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। (ইমাম ইবনু কাসীর বলেন : সনদ সহীহ।)
অন্যান্য বর্ণনায় তা আবূ জাহলের এমনকি আবূ লাহাবের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। (ইবনু কাসীর)
যে বর্ণনায় বলা হয়েছে, যখন নাবী (সাঃ)-এর পুত্রগণ পরপর মারা যেতে লাগল এবং সর্বশেষ পুত্র ইবরাহীম মারা গেল তখন আস বিন ওয়ায়িল বলল : বাদ দাও মুহাম্মাদের কথা, সে এমন লোক যার কোন বংশধর বাকী নেই, সে লেজকাটা নির্বংশ। তখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। এ বর্ণনাটি সহীহ নয়। (ইবনু হিশাম ১/৩২২, সূরা কাউসারের আলোচনা।)
الْأَبْتَرُ এমন ব্যক্তিকে বলা হয় যে নির্বংশ, যার পুত্র সন্তান জীবিত থাকে না।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. কাউসারের সঠিক তাফসীর জানলাম।
২. বিদ‘আতীরা কাউসারের পানি পান করার সৌভাগ্য লাভ করবে না।
৩. সালাতের মত কুরবানী একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। তাই তা করতে হবে একমাত্র আল্লাহর জন্যই।
# তাফসীরে ইবনে কাছীর:-
১-৩ নং আয়াতের তাফসীর
মুসনাদে আহমদে হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কিছুক্ষণ তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়েছিলেন। হঠাৎ মাথা তুলে হাসিমুখে তিনি বললেন অথবা তার হাসির কারণ জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বললেনঃ “এই মাত্র আমার উপর একটি সূরা অবতীর্ণ হয়েছে। তারপর তিনি বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম পড়ে সূরা কাওসার পাঠ করলেন। তারপর তিনি সাহাবীদেরকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “কাওসার কি তা কি তোমরা জান?” উত্তরে তারা বললেনঃ “আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলই (সঃ) ভাল জানেন।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “কাওসার হলো একটা জান্নাতী নহর। তাতে বহু কল্যাণ নিহিত রয়েছে। মহামহিমান্বিত আল্লাহ আমাকে এটা দান করেছেন। কিয়ামতের দিন আমার উম্মত সেই কাওসারের ধারে সমবেত হবে। আসমানে যতো নক্ষত্র রয়েছে সেই কাওসারের পিয়ালার সংখ্যাও ততো। কিছু লোককে কাওসার থেকে সরিয়ে দেয়া হবে তখন আমি বলবো: হে আমার প্রতিপালক! এরা আমার উম্মত!” তখন তিনি আমাকে বলবেনঃ “তুমি জান না, তোমার (ইন্তেকালের) পর তারা কত রকম বিদআত আবিষ্কার করেছে!”
হাদীস শরীফে রয়েছে যে, সেই কাওসারের দুটি ধারা আকাশ থেকে অবতরণ করবে।
সুনানে নাসাঈতে রয়েছে যে, এ ঘটনা মসজিদে নববীতে (সঃ) ঘটেছে। এজন্যেই অধিকাংশ কারী বলেন যে, এ সূরা মদীনায় অবতীর্ণ হয়েছে। অধিকাংশ ফিকাহবিদ এ হাদীস থেকেই ব্যাখ্যা করেছেন যে, বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম’ প্রত্যেক সূরার সাথেই অবতীর্ণ হয়েছে এবং এটা প্রত্যেক সূরার পৃথক আয়াত।
মুসনাদের অন্য একটি হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ সূরার আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করে বলেনঃ “আমাকে কাওসার দান করা হয়েছে। কাওসার একটি প্রবাহিত ঝর্ণা বা নহর, কিন্তু গর্ত নয়। ওর দুপাশে মুক্তার তৈরি তবু রয়েছে। ওর মাটি খাটি মিশকের ওর পাথরও খাঁটি মুক্তাদ্বারা নির্মিত।
অন্য এক বর্ণনায় রয়েছে যে, মিরাজের রাত্রে রাসূলুল্লাহ (সঃ) আসমানে জান্নাতে এ নহর দেখেছিলেন। এবং হযরত জিবরাঈল (আঃ) কে জিজ্ঞেস করেছিলেনঃ “এটা কোন নহর?” হযরত জিবরাঈল (আঃ) উত্তরে বলেছিলেনঃ “এর নাম কাওসার, যে কাওসার আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা’আলা আপনাকে দান করেছেন। এ ধরনের বহু হাদীস রয়েছে।
অন্য এক হাদীসে আছে যে, কাওসারের পানি দুধের চেয়েও বেশী সাদা, মধুর চেয়েও বেশী মিষ্ট। সেই কাওসারের তীরে লম্বাগ্রীবা বিশিষ্ট পাখিরা বসে রয়েছে। হযরত আবু বকর (রাঃ) একথা শুনে বললেনঃ “সে সব পাখি তো খুব সুন্দর!” নবী করীম (সঃ) বললেনঃ ‘সেগুলো খেতেও খুব সুস্বাদু।” অন্য এক বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত আনাস (রাঃ) রাসূলুল্লাহকে (সঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “কাওসার কি?” উত্তরে তিনি এ হাদীসটি বর্ণনা করলে হযরত উমার (রাঃ) পাখিগুলো সম্পর্কে উপরোক্ত কথা বলেন। (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমদে বর্ণিত হয়েছে)
হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন এ নহরটি জান্নাতের মধ্যস্থলে অবস্থিত। (এ হাদীসটি মুনকার বা অস্বীকৃত)। হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে আরো বর্ণিত আছে, যে ব্যক্তি কাওসারের পানি ঝরার শব্দ শুনতে পছন্দ করে সে যেন তার অঙ্গুলিদ্বয় তার কর্ণদ্বয়ে রাখে। (সনদের দিক দিয়ে এ হাদীসটি মুনকাতা বা ছেদ কাটা) প্রথমতঃ এ হাদীসের সনদ সমার্থ নয়, দ্বিতীয়তঃ অর্থ হলো কানে আঙ্গুল দিয়ে কাওসারের পানি ঝরার মত শব্দ শোনা যাবে, অবিকল সেই আওয়াজই যে শোনা যাবে এমন নয়। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।
সহীহ বুখারী শরীফে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, কাওসারের মধ্যে ঐ কল্যাণ নিহিত রয়েছে যা আল্লাহ তা’আলা খাস করে তার নবী (সঃ)-কে দান করেছেন। আবু বাশার (রঃ) সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রাঃ) কে বলেনঃ লোকদের তো ধারণা এই যে, কাওসার হলো জান্নাতের একটি নহর। তখন হযরত সাঈদ (রঃ) বললেনঃ জান্নাতে যে নহরটি রয়েছে সেটা ঐ কল্যাণের অন্তর্ভুক্ত যা আল্লাহ খাস করে তার নবী (সঃ)-কে প্রদান করেছেন।
হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে আরো বর্ণিত আছে যে, কাওসার হলো বহু কল্যান। বহু সংখ্যক তাফসীরকার এরকমই লিপিবদ্ধ করেছেন। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, কাওসার দ্বারা দুনিয়ার ও আখেরাতের বহু প্রকারের কল্যাণের কথা বুঝানো হয়েছে। ইকরামা (রঃ) বলেন যে, কাওসার দ্বারা নবুওয়াত, কুরআন ও পরকালের পুণ্যকে বুঝানো হয়েছে। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) কাওসারের তাফসীরে নহরে কাওসারও বলেছেন।
তাফসীরে ইবনে জারীরে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, কাওসার হলো জান্নাতের একটি নহর যার উভয় তীর স্বর্ণ ও রৌপ্য নির্মিত। ইয়াকূত ও মণি-মুক্তার উপর ওর পানি প্রবাহিত হচ্ছে। ঐ কাওসারের পানি বরফের চেয়েও অধিক সাদা এবং মধুর চেয়েও অধিক মিষ্টি। (ইমাম তিরমিযী (রঃ) এবং ইমাম ইববে মাজাহ (রঃ) এ হাদীসটি মারফু রূপেও বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান সহীহ বলেছেন)
তাফসীরে ইবনে জারীরে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত হামযার (রাঃ) বাড়িতে আগমন করেন। হযরত হামযা (রাঃ) ঐ সময় বাড়িতে ছিলেন না। তাঁর স্ত্রী বানূ নাজ্জার গোত্রীয়া মহিলা বাড়ীতে অবস্থান করছিলেন। তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বললেনঃ “আমার স্বামী এই মাত্র আপনার সাথে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়েছেন। সম্ভবতঃ তিনি বানু নাজ্জারের ওখানে। আটকা পড়ে গেছেন। আপনি এসে বসুন।” অতঃপর হযরত হামযার (রাঃ) স্ত্রী রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনে মালীদা (এক প্রকার খাদ্য) পেশ করলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তা আহার করলেন। হযরত হামযা’র (রাঃ) স্ত্রী আনন্দের সুরে বললেনঃ “আপনি নিজেই আমাদের গরীব খানায় তাশরীফ এনেছেন এটা আমাদের পরম সৌভাগ্য। আমি তো ভেবেছিলাম যে আপনার দরবারে হাজির হয়ে আপনাকে হাউযে কাওসার প্রাপ্তি উপলক্ষে মুবারকবাদ জানাবো। এই মাত্র হযরত আবূ আম্মারাহ (রাঃ) আমার কাছে এই সুসংবাদ পৌঁছিয়েছেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বললেনঃ “হ্যা, সেই হাউযে কাওসারের মাটি হলো ইয়াকূত, পদ্মরাগ, পান্না এবং মণি মুক্তা।” খারামা ইবনে উসমান নামক এ হাদীসের একজন বর্ণনাকারী দুর্বল। তবে এটাকে হাসান বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
বহু সংখ্যক সাহাবী এবং তাবিয়ীর বর্ণনা থেকে প্রমাণিত হয়েছে যে, কাওসার একটি নহরের নাম।
আল্লাহ্ তাআলা বলেনঃ হে নবী (সঃ)! নিশ্চয়ই আমি তোমাকে কাওসার দান করেছি। অতএব তুমি স্বীয় প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে নামায পড় এবং করবানী কর। নিশ্চয় তোমার প্রতি বিদ্বেষ পোষণকারীরাই তো নির্বংশ। অর্থাৎ হে নবী। (সঃ) তুমি নফল নামায ও কুরবানীর মাধ্যমে লা-শারীক আল্লাহর ইবাদত কর। যেমন অন্য জায়গায় আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবি)
অর্থাৎ “বলঃ আমার নামায, আমার ইবাদত, আমার জীবন ও আমার মরণ জগৎসমূহের প্রতিপালক আল্লাহ্রই উদ্দেশ্যে। তাঁর কোন শরীক নেই এবং আমি তাই আদিষ্ট হয়েছি এবং আত্মসমর্পনকারীদের মধ্যে আমিই প্রথম।” (৬ ? ১৬২-১৬৩)।
কুরবানী দ্বারা এখানে উট বা অন্য পশু কুরবানীর কথা বলা হয়েছে। মুশরিকরা সিজদা’ এবং কুরবানী আল্লাহ্ ছাড়া অন্যদের নামে করতো। এখানে আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তাআলা নির্দেশ দিচ্ছেনঃ তোমরা শুধুমাত্র আল্লাহরই ইবাদত করো। যেমন আল্লাহ্ পাক অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি)
অর্থাৎ যে পশু কুরবানীতে আল্লাহর নাম নেয়া হয় না তা তোমরা খেয়োনা, কেননা, এটা ফিসক বা অন্যায়াচরণ।” (৬:১২১) এটাও বলা হয়েছে যে, (আরবি) এর অর্থ হলো নামাযের সময়ে ডান হাত বাম হাতের উপর রেখে বুকে বাধা। এটা হযরত আলী (রাঃ) হতে গায়ের সহীহ সনদের সাথে বর্ণিত হয়েছে। হযরত শাবী (রঃ) এ শব্দের তাফসীর এটাই করেছেন।
হযরত আবু জাফর বাকির (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হলো নামায শুরু করার সময় হাত উঠানো। একথাও বলা হয়েছে যে, এর ভাবার্থ হলোঃ বুক কিবলার দিক রেখে কিবলা মুখী হওয়া। (এই তিনটি উক্তিই ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে এ জায়গায় একটি নিতান্ত মুনকার হাদীস বর্ণিত আছে। তাতে আছে যে, এ সূরা অবতীর্ণ হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হে জিবরাঈল (আঃ)! এর অর্থ কি?” উত্তরে হযরত জিবরাঈল (আঃ) বলেনঃ “(আরবি) এর অর্থ কুরবানী নয়, বরং আপনার প্রতিপালক আপনাকে নামাযে তাকবীরে তাহরীমার সময়, রুকুর সময়, রুকু হতে মাথা উঠানোর সময় এবং সিজদাহ করার সময় দু’হাত তোলার নির্দেশ দিয়েছেন। এটাই আমাদের এবং যে সব ফেরেশতা সপ্তম আকাশে রয়েছেন তাদের নামায। প্রত্যেক জিনিষের সৌন্দর্য রয়েছে, নামাযের সৌন্দর্য হলো প্রত্যেক তাকবীরের সময় হাত উঠাননা।”
হযরত আতা খুরাসানী (রঃ) বলেন যে, (আরবি) এর অর্থ হলো নিজের পিঠ রুকু হতে উঠানোর সময় সমতল করে বুক প্রকাশ করে অর্থাৎ স্বস্তি অর্জন করো। এগুলো সবই গারীব বা দুর্বল উক্তি।
(আরবি) এর অর্থ কুরবানীর পশু জবাহ করা এ উক্তিটিই হলো সঠিক উক্তি। এ জন্যেই রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঈদের নামায শেষ করার পরপরই নিজের কুরবানীর পশু যবাহ করতেন এবং বলতেনঃ “যে আমাদের নামাযের মত নামায পড়েছে এবং আমাদের কুরবানীর মত কুরবানী করেছে সে শরীয়ত সম্মতভাবে কুরবানী করেছে। আর যে ব্যক্তি (ঈদের) নামাযের পূর্বেই কুরবানী করেছে তার কুরবানী আদায় হয়নি। একথা শুনে হযরত আবু বারদাহ ইবনে দীনার (রাঃ) দাঁড়িয়ে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)। আজকের দিনে গোশতের চাহিদা বেশী হবে ভেবেই কি আপনি নামাযের পূর্বেই কুরবানী করে ফেলেছেন?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “তা হলে তো খাওয়ার গোশতই হয়ে গেল অর্থাৎ কুরবানী হলো না।” সাহাবীগণ বললেনঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! বর্তমানে আমার কাছে একটি বকরীর শাবক রয়েছে, কিন্তু ওটা দুটি বকরীর চেয়েও আমার কাছে অধিক প্রিয়। এ বকরীর শাবকটি কি আমার জন্যে যথেষ্ট হবে?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “হ্যা, তোমার জন্যে যথেষ্ট হবে বটে, কিন্তু তোমার পরে ছয় মাসের বকরী শাবক অন্য কেউ কুরবানী করতে পারবে না।”
ইমাম আবু জাফর ইবনে জারীর (রঃ) বলেনঃ তার কথাই যথার্থ যে বলে যে, এর অর্থ হলোঃ নিজের সকল নামায শুধুমাত্র আল্লাহর জন্যে আদায় করো, তিনি ছাড়া অন্য কারো জন্যে আদায় করো না। তার কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন কর যিনি তোমাকে এরকম বুযুগী ও নিয়ামত দান করেছেন যে রকম বুযুগী ও নিয়ামত অন্য কাউকেও দান করেননি। এটা একমাত্র তোমার জন্যেই নির্ধারিত করেছেন। এই উক্তিটি খুবই উত্তম।
মুহাম্মদ ইবনে কা’ব কারাযী (রঃ) এবং আতা (রঃ) একই কথা বলেছেন। আল্লাহ তাআলা সুরার শেষ আয়াতে বলেছেনঃ নিশ্চয় তোমার প্রতি বিদ্বেষ পোষনকারীই তো নির্বংশ। অর্থাৎ যারা তোমার (হযরত মুহাম্মদ (সঃ)-এর) শত্রুতা করে, তারাই অপমানিত, লাঞ্ছিত, তাদেরই লেজকাটা।
এই আয়াত আস ইবনে ওয়ায়েল সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়। এই দুবৃত্ত রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আলোচনা শুনলেই বলতোঃ “ওর কথা রাখো, ওর কথা রাখো, ওর কোন পুত্র সন্তান নেই। মৃত্যুর পরই সে বেনাম-নিশান হয়ে যাবে। (নাউযুবিল্লাহ)। আল্লাহ তাআলা তখন এ সূরা অবতীর্ণ করেন।
শামর ইবনে আতিয়্যাহ (রঃ) বলেন যে, উকবা ইবনে আবী মুঈত সম্পর্কে এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, কা’ব ইবনে আশরাফ এবং কুরায়েশদের একটি দল সম্পর্কে এ সূরা অবতীর্ণ হয়।
মুসনাদে বাযযারে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, কা’ব ইবনে আশরাফ যখন মক্কায় আসে তখন কুরায়েশরা তাকে বলেঃ “আপনি তো তাদের সর্দার, আপনি কি ঐ ছোকরাকে (হযরত মুহাম্মদ (সঃ)-কে দেখতে পান সে সমগ্র জাতি থেকে পৃথক হয়ে আছে, এতদসত্ত্বেও নিজেকে সবচেয়ে ভাল ও শ্রেষ্ঠ মনে করছে। অথচ আমরা হাজীদের বংশধর, কাবাগৃহের তত্ত্বাবধায়ক এবং যমযম কূপের দেখাশোনাকারী।” দুবৃত্ত কা’ব তখন বললোঃ “নিঃসন্দেহে তোমরা তার চেয়ে উত্তম। আল্লাহ তা’আলা তখন এ আয়াত অবতীর্ণ করেন। এ হাদীসের সনদ সহীহ বা বিশুদ্ধ।
হযরত আতা’ (রঃ) বলেন যে, এ আয়াত আবূ লাহাব সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর সন্তানের ইন্তেকালের পর এ দুর্ভাগা দুবৃত্ত মুশরিকদেরকে বলতে লাগলো “আজ রাত্রে মুহাম্মদ (সঃ)-এর বংশধারা বিলোপ করা হয়েছে।” আল্লাহ তাআলা তখন এ আয়াত অবতীর্ণ করেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে এ উক্তি বর্ণিত হয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এটাও বলেছেন যে, এখানে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সমস্ত শত্রুকেই বুঝানো হয়েছে। যাদের নাম নেয়া হয়েছে এবং যাদের নাম নেয়া হয়নি তাদের সকলকেই বুঝানো হয়েছে।
শব্দের অর্থ হলো একাকী। আরবে এ প্রচলন রয়েছে যে, যখন কারো একমাত্র সন্তান মারা যায় তখন তাকে আবার বলা হয়ে থাকে। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সন্তানদের ইন্তেকালের পর শত্রুতার কারণে তারা তাকে আবতার বলছিল। আল্লাহ তাআলা তখন এ আয়াত অবতীর্ণ করেন। আবতার’ এর অর্থ দাঁড়ালোঃ যার মৃত্যুর পর তার সম্পর্কিত আলোচনা, নাম নিশানা মুছে যায়। মুশরিকরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সম্পর্কেও ধারণা করেছিল যে, সন্তান বেঁচে থাকলে তার আলোচনা জাগরুক থাকতো। এখন আর সেটা সম্ভব নয়। অথচ তারা জানে না যে, পৃথিবী টিকে থাকা অবধি আল্লাহ তা’আলা তাঁর প্রিয় নবী (সঃ)-এর নাম টিকিয়ে রাখবেন। নবী করীম (সঃ)-এর শরীয়ত চিরকাল বাকি থাকবে। তার আনুগত্য সকল শ্রেণীর মানুষের জন্যে অত্যাবশ্যক ঘোষণা করা হয়েছে। তাঁর প্রিয় ও পবিত্র নাম সকল মুসলমানের মনে ও মুখে রয়েছে। কিয়ামত পর্যন্ত তার নাম আকাশতলে উজ্জ্বল ও দীপ্তিমান থাকবে। জলে স্থলে সর্বদা তাঁর নাম আলোকিত হতে থাকবে। আল্লাহ তা’আলা কিয়ামত পর্যন্ত আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ) এবং তার আল ও আসহাবের প্রতি দরূদ ও সালাম সর্বাধিক পরিমাণে প্রেরণ করুন। আমীন!